‘নরম’ ডিউকস বলের মান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন, তদন্তে নির্মাতারা

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৫, ০৬:১১ পিএম

ইংল্যান্ড ও ভারতের মধ্যে চলমান টেস্ট সিরিজের প্রথম তিন ম্যাচেই বারবার বল বদলাতে হয়েছে। কখনো ১০.২ ওভারেই বল পরিবর্তন, আবার কখনো একটা ইনিংসে পাঁচবার। এই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কারণ—ডিউকস বল অনেক আগেই নরম হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ম্যাচে ছন্দপতন হচ্ছে, বোলাররা অসন্তুষ্ট, আর আম্পায়ারদেরও বল বদলের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বারবার।

এই পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড, সংক্ষেপে ইসিবি, সিদ্ধান্ত নিয়েছে যত বেশি সম্ভব ব্যবহৃত বল সংগ্রহ করে সপ্তাহের শেষের দিকে তা পাঠাবে বল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ ক্রিকেট বলস লিমিটেড-এর কাছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দিলিপ জাজোদিয়া জানিয়েছেন, তারা প্রতিটি বলের গঠন ও ব্যবহৃত কাঁচামাল খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করবেন এবং প্রয়োজনে ট্যানারির সঙ্গে কথা বলে ত্বকের গুণমানসহ অন্যান্য উপাদানে পরিবর্তন আনবেন।

সমস্যার মূলে কী?

টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিটি স্বাগতিক দেশ নিজেদের মাঠে যে বল ব্যবহার করবে, তা নিজেরাই নির্ধারণ করে। ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিউকস বল। ভারতে খেলা হয় এসজি দিয়ে আর অস্ট্রেলিয়ায় কুকাবুরা দিয়ে।

ডিউকস বল ১৭৬০ সাল থেকে উৎপাদন হচ্ছে এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে মানসম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বল নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগ—এই বল খুব তাড়াতাড়ি নরম হয়ে যাচ্ছে, বিশেষত ৮০ ওভার পূর্ণ হওয়ার আগেই। বল নরম হয়ে গেলে উইকেট নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পিচ থেকে আর আগের মতো গতি পাওয়া যায় না, বল কম সুইং করে এবং ব্যাটসম্যানরা সহজে সামলে নিতে পারে। স্লিপে ক্যাচও কম যেতে দেখা যায়।

ইসিবির প্রফেশনাল গেম কমিটি ও ক্রিকেট অ্যাডভাইজরি গ্রুপ মৌসুমজুড়ে বল সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে। তাঁরা ইতিমধ্যেই খেলোয়াড় ও আম্পায়ারদের কাছ থেকে বেশি বেশি বল পরিবর্তনের রিপোর্ট পেয়েছেন। বিশেষ করে লর্ডস টেস্টে বিষয়টি চূড়ান্ত আলোচনায় উঠে আসে। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে পাঁচবার বল পরিবর্তন করতে হয়, যার মধ্যে একটি বল বদলানো হয় মাত্র ১০.২ ওভারে।

সাবেক ইংল্যান্ড পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড একে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘ক্রিকেট বল হওয়া উচিত এক নিঃশব্দ উইকেটকিপারের মতো—যার উপস্থিতিই টের পাওয়া যায় না। এখন আমরা বল নিয়েই বেশি আলোচনা করছি কারণ এটি একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি ইনিংসেই বল বদলাতে হচ্ছে। এটা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। ডিউকসের একটা সমস্যা হয়েছে, এবং তাদের এটা দ্রুত ঠিক করতে হবে।’

সমস্যার উৎস কোথায়?

ডিউকস বল তৈরির পদ্ধতি এখনো অনেকটাই ঐতিহ্যগত। কর্ক দিয়ে তৈরি কোরকে সুতা দিয়ে মোড়া হয়, তারপর গরুর চামড়ায় আবৃত করে হাতে সেলাই করা হয় সিম। এই চামড়া রঙে ডুবানো হয়, আর সেখানেও মানের ভিন্নতা থাকতে পারে।

বল প্রস্তুতকারক দিলিপ জাজোদিয়া বলছেন, একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবিক কারণ এর জন্য দায়ী হতে পারে। প্রাথমিকভাবে তিনি চামড়ার মানের কথাই বলছেন। গরুর চামড়ার ফাইবার যদি দুর্বল হয় বা তাতে কোনো আভ্যন্তরীণ ত্রুটি থাকে, তবে সেটি উৎপাদনের সময় ধরা পড়ে না—বল মাঠে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পরই বোঝা যায়।

তাঁর ভাষায়, কোভিড মহামারির সময় অনেক দক্ষ চর্মশিল্পী মারা গেছেন কিংবা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এতে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটেছে। অনেক রাসায়নিকও এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি গরু ও চামড়ার মানেও পরিবর্তন এসেছে।

জাজোদিয়া বলেন, “এই মুহূর্তে মাত্র একটি ট্যানারি আছে যারা ক্রিকেট বলের চামড়া তৈরি করে। আমাদের সেই একমাত্র উৎসের সঙ্গেই কাজ চালিয়ে যেতে হয় এবং তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। বল তৈরিতে সব উপাদান পরীক্ষা করে নেওয়া হয়, কিন্তু মাঠে গিয়ে বলটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটা আগে থেকে বলা সম্ভব না। সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ।”

তিনি আরও বলেন, আধুনিক ক্রিকেটের ধরনও বলের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বড় ব্যাট, বেশি ছক্কা, শক্ত পিচ—সব মিলিয়ে বলকে তুলনামূলকভাবে বেশি ‘হিট’ সহ্য করতে হচ্ছে।

সমাধান কী হতে পারে?

জাজোদিয়া একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করেছেন, বল পরিবর্তনের ওভার সীমা ৮০ থেকে কমিয়ে ৬৫ করা যেতে পারে। তবে তিনি নিজেই এটিকে জনপ্রিয় বা স্থায়ী সমাধান মনে করছেন না। তাঁর মতে, “আমরা যেসব টেস্ট ম্যাচ খেলেছি, সবগুলোই জমজমাট ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। তাই এত বছর ধরে ব্যবহৃত এই পণ্যের ব্যাপারে খুব হঠাৎ করে বড় পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না।”

তবে সমস্যা অস্বীকার করছেন না তিনি। বলেছেন, প্রতিটি বল তাঁর নিজের হাতে বাছাই করা হয় এবং নতুন বল দেখতে সত্যিই শিল্পকর্মের মতো। কিন্তু ম্যাচ চলাকালে বল মার খাওয়ার পর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাই সব চেয়ে বড় প্রশ্ন।

বিকল্প বলের কথা কী?

ইসিবির সঙ্গে ডিউকস বলের চুক্তি বার্ষিক, মানে প্রতি বছর চাইলে তারা অন্য বল ব্যবহার করতে পারে। কাউন্টি দ্বিতীয় বিভাগে হ্যান্ড-স্টিচড গান অ্যান্ড মুর বল ব্যবহার হয়। প্রয়োজনে ডিউকসের বিকল্প হিসেবে সেটিও ভাবা যেতে পারে।

২০২৩ সাল থেকে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে পরীক্ষামূলকভাবে কুকাবুরা বল চালু হয়েছে, এবং এবার চারটি রাউন্ডে এই বল ব্যবহৃত হচ্ছে। এই উদ্যোগ এসেছে মূলত ইংল্যান্ড দলের দিক থেকে—বিদেশে খেলতে গিয়ে বোলাররা যাতে অভ্যস্ত হয় কুকাবুরা বলের সঙ্গে।

তবে এই বল দিয়ে খেলা ম্যাচগুলোতে রানসংখ্যা বেড়ে গেছে। দুই রাউন্ডের হিসাব বলছে, প্রতি ম্যাচে গড় রান হয়েছে প্রায় ১,১৯৫! কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কুকাবুরা বল তুলনামূলকভাবে শক্ত পিচে ভালো পারফর্ম করে, ইংল্যান্ডের নরম পিচে নয়।

ক্রিকেট বল মাঠের অন্যতম নীরব নায়ক। তার কাজ যেন চোখে না পড়ে, অথচ পুরো খেলাকে প্রভাবিত করে। ডিউকস বল নিয়ে যে আলোচনা এখন চলছে, সেটা শুধু একটি ব্র্যান্ড বা কোম্পানির নয়—পুরো ক্রিকেট কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। ঐতিহ্য ধরে রাখা আর আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে চলা—এই দুইয়ের ভারসাম্যেই হয়তো মিলবে সমাধান।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত