ডাব বিক্রেতাদের কাছে জিম্মি ডেঙ্গু রোগী-স্বজনরা

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৫, ০৭:১৮ পিএম

ডেঙ্গু, জ্বর ও চিকনগুনিয়াতে আক্রান্ত নগরের বেশিরভাগ মানুষ যখন সুস্থ হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টায় ব্যস্ত তখন এসব রোগকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট করে ডাবের দাম ইচ্ছামত বাড়িয়ে বিক্রি করছে ডাব বিক্রেতারা। নগরের সব হাসপাতালের সামনে ডাব বিক্রেতাদের রমরমা অবস্থা। স্থানভেদে মাঝারি থেকে বড় ডাবের দাম নেওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ বা ২০০ টাকা পর্যন্ত।এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে ক্রেতাদের শুনতে হয় নানা ধরনের কটূক্তি।

তেমনই একজন ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন। টানা জ্বর ও শরীর ব্যথা নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে পান তিনি ডেঙ্গু পজিটিভ, সঙ্গে শরীরে পানিশূন্যতা। তাই ঝুঁকি না নিয়ে ভর্তি হয়ে যান নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। ভর্তি থাকাকালীন সময়ে প্রতিদিন তার স্বজনরা ডাব কিনতে গিয়ে দেখেন ডাবের দাম স্বাভাবিক সময় থেকে অনেক বেশি। প্রতিদিন দুইটি ডাব কিনতে তার খরচ পড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। দাম কমানোর কথা বললে ক্রেতারা ডাব বিক্রি করতে অনীহা দেখায়।

আরেকজন দিনমজুর মোহাম্মদ সেলিম ১৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে ভর্তি করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তাররা জানান ডাব সহ তরল জাতীয় খাবারই ডেঙ্গু রোগের প্রধান চিকিৎসা। তাই তিনি মেডিকেলের বাইরের ভ্যান গুলোতে যান ডাব কিনতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ডামের দাম জানতে চাইলে দেড়শ টাকা চাওয়া হয়। এই শুনে তার চক্ষু চড়কগাছ। কিছুটা বড় সাইজের দাম ১৬০-১৮০ টাকা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের প্রধান গেটের সামনে থাকা বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে ডাব কিনতে না পেরে পরে হতাশ হয়ে ফিরে যান দিনমজুর সেলিম।

মেডিকেল গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেলিম দেশ রূপান্তর কে বলেন, মেয়েকে নিয়ে সকালে ভর্তি করলাম কিন্তু এখন ডাব কিনতে গিয়ে যে দাম চাইছে তা কেনা আমার পক্ষে সম্ভব না। এভাবে প্রতিদিন মেয়েকে ডাব খাওয়াতে হলে আমাকে ঋণ করতে হবে। কিন্তু আমি যে কাজ করি সে আয় দিয়ে মেয়ের চিকিৎসা করাবো নাকি ঋণ পরিশোধ করবো?

নগরের প্রায় হাসপাতাল গুলোতে এখন ডেঙ্গু, জ্বর বা চিকনগুনিয়া আক্রান্ত রোগীতে ভরা। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমত দাম আদায় করছেন ক্রেতাদের কাছে। ডেঙ্গু অনেক পরিবারের জন্য দুর্দশার কারণ হলেও তা অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য উৎসবে পরিণত হয়েছে।

চিকিৎসকরা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে তরল খাবার বিশেষ করে ডাবের পানি খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। আর বাড়তি এই চাহিদাকে পুঁজি করে ডাবের দাম নিয়ে চট্টগ্রামে চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এখন একটি ডাব কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৫০ টাকার ওপরে। অথচ অন্য সময়ে একই ডাবের দাম ছিল ১০০  টাকা বা তারও কম। বাজার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ডাবের দাম নির্ধারিত না থাকলেও অবশ্যই ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে তারা ইচ্ছেমত দামে বিক্রি করে এসব ডাব। বিশেষ করে চমেক ও জেনারেল হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চারপাশে থাকা ব্যবসায়ীরাই ডাব নিয়ে নৈরাজ্য বেশি করছেন।

এসব এলাকায় রোগীর চাপ বেশি থাকায় ডাবের চাহিদাও বেশি। এদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং লাভজনক হওয়ায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ডাব কিনে এনে বিক্রি করছেন উচ্চমূল্যে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগকে পুঁজি করে অনেক ব্যবসায়ী ডাবের দাম বাড়ানর তথ্য আমরা পাচ্ছি। ডাবের দাম বাড়ানোটাও অযৌক্তিক তাই আমরা খুব দ্রুত অভিযান পরিচালনা করবো।

সরকারের পক্ষ থেকে ডাবের দাম নির্ধারিত করা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোন দাম নির্ধারিত নেই এবং আমাদের পক্ষ থেকেও দাম নির্ধারণের সুযোগ নেই। তবে সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলে আমরা সেটির বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটি তদারকি করে থাকি।যেহেতু দাম নির্ধারণ করা নেই তাই এই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। 

দাম নির্ধারণের ব্যাপারে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডাব কৃষি পণ্য হিসেবে নির্ধারিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এর জন্য কোন দাম নির্ধারিত থাকে না। যার ফলে বাজারে খুচরা ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমাফিক দামে বিক্রি করেন। আমরা ভোক্তা অধিকার ও জেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে অভিযানের ব্যাপারে কথা বলবো। 

চট্টগ্রামের এশিয়ান স্পেসালাইজড হাসপাতালের চিকিৎসক আমীর খসরু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ থাকে আমাদের। সে ক্ষেত্রে বাজারে ডাব সবসময় পাওয়া গেলেও দাম বেশি নেওয়া হয়। তাই আমরা ডাবের বিকল্প হিসেবে রোগীদের খাবার স্যালাইন গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছি। 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আমরা এই ইস্যুতে এখনো কোনো উদ্যোগ নিতে পারিনি। এমনিতে চাল ডালের যে ইস্যুগুলো চলমান আছে সেগুলোই আমরা সমাধান করতে পারছি না। তবে ডেঙ্গুর অবস্থা প্রকট হলে আমরা এই বিষয়ে কথা বলবো। 

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে গত সাতমাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৬৪৩ জন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত