বিশ্ব জুড়ে কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনের জয়লাভ এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে আমাদের কাছে। এই একুশ শতকেও অধিকাংশ সাদা চামড়ার মানুষ এখনো কতটা বর্ণবাদী। যতই মুখে মুখে এরা সাম্যের কথা বলুক, কার্যত তারা ভয়ানকভাবে বর্ণবাদী যেমনটা ছিল মধ্যযুগ, উপনিবেশ আমলে। দূর থেকে আমরা হয়তো প্রকৃত অনুধাবন করতে পারি না। কেউ বর্ণবাদী নিজ গোত্রে, নিজ বর্ণের মানুষের মধ্যে। কিন্তু যদি চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, তাদের কার্যকলাপে ঠিকই টের পাবেন এই বর্ণবাদ। কেন তাদের সহজে চোখে পড়ে না? নানা কারণে। প্রথমত এরা জানে, বর্ণবাদ এখন আর গর্বের বিষয় নয় যদি প্রমাণিত হয় আপনি বর্ণবাদী, তাহলে আপনি যে প্রগতিশীল নন, শিক্ষিত নন, ইতিহাস যে পড়েন না, জানেন না তা প্রকাশ হয়ে যায়। সেটি তারা হতে দিতে চান না। অথচ সাম্প্রতিক সময় নির্বাচনে বিশ্বে ডানপন্থি দলগুলোর পূর্ণ বিজয় ও বামপন্থি দলগুলোর পরাজয় বিষয়টি সামনে তুলে আনে যে, এখনো বর্ণবাদ কতটা পোষণ করে চলছে ওই দেশগুলোর অধিকাংশ দেশের মানুষ। এখন পর্যন্ত যেসব দেশে এই কট্টর ডানপন্থি দলগুলো ক্ষমতায় এসেছে তাদের ৯৫ ভাগই ইউরোপীয় দেশ। তার মধ্যে পড়ে সব বড় বড় নাম। জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, বেলজিয়াম, গ্রিস, সুইডেন, পোল্যান্ড এবং সর্বশেষ পর্তুগাল। ইউকে-তে কেবলমাত্র বামপন্থি দলের জয় হয়েছে কিন্তু এক বছর আগেও বরিস জনসন ও তার কট্টরপন্থি দলের অভিবাসনবিরোধী কার্যকলাপ এটি স্পষ্ট করে যে, সাম্প্রতিক সময়েও যুক্তরাজ্য কতটা বর্ণবাদী। আর ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প তো ক্ষমতায় এসেছেন খোলাখুলি ন্যক্কারজনকভাবে মূলত অভিবাসনবিরোধী নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে। মূলত এই সবই সাদা চামড়ার মানুষের দেশ। এসব দলের ভোটাররাও সাদা চামড়ার। এরা সবাই অভিবাসনবিরোধী। এরা মনেপ্রাণে ঘৃণা করে অভিবাসীদের। যদি অভিবাসীরা বিভিন্ন কাজে অপরিহার্য না হতো, তাহলে সমূলে এদের দূর করে দিত নিজ দেশ থেকে এরা। কট্টর ডানপন্থিদের সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক হারে জয়লাভ যে কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয় এবং সেই দলগুলোর দ্বারা কঠোর অভিবাসন নীতি প্রণয়ন যে কতটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ মানবজাতির ইতিহাসে যা গোনা কয়েকটি অপরাধের তালিকা করলে তার মধ্যে পড়বে, সেটি পশ্চিমা গণমাধ্যম কখনোই আপনার সামনে তুলে ধরবে না।
ইউরোপের দেশগুলো যারা অভিবাসী হটাও নীতিতে জোরেশোরে কোমর বেঁধে নেমেছে, এরা প্রত্যেকেই এই অভিবাসন প্রার্থীদের দেশগুলোতে ৫০০ বছর আগ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২৫ বছর আগ পর্যন্ত অভিবাসীদের দেশগুলোতে উপনিবেশ স্থাপন করে এদের শোষণ করেছে, এর আর্থসামাজিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে, লুটপাট করেছে। পর্তুগাল আর স্পেন ৫০০ বছর আগে সারা পৃথিবীতে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়েছিল যে আটলান্টিকের পশ্চিমের দেশগুলো ব্রাজিল বাদে স্পেন আর পূর্বের সব দেশগুলো পর্তুগালের। আজ লাতিন আমেরিকার সবগুলো দেশের ভাষা, ব্রাজিল ছাড়া, যে স্প্যানিশ এই ঘটনায় সেই ইতিহাস বহন করে। আর অন্যদিকে ব্রাজিলসহ সম্পূর্ণ আফ্রিকার, এশিয়ার দক্ষিণ উপকূল ঘেঁষা দেশগুলোতে সব পর্তুগালের ঘাঁটি চোখে পড়বে। মরক্কো থেকে শুরু করে সেনেগাল, গাম্বিয়ার উপকূল, কেপ ভারদে, গিনি বিসাও, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, ওমান ভারতের কালিকট, গোয়া, মালয়েশিয়ায়, শ্রীলঙ্কায়, ইন্দোনেশিয়ায়, চীনের মাকাও, জাপানে, পূর্ব তিমুর সব একসময়ে পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। শুধু মানচিত্রে এই দেশগুলোর নামে একটি করে দাগ দিলে দেখবেন যে কী দুর্দান্তভাবে জলপথ জয় করে উপনিবেশ স্থাপন করেছে সারা বিশ্বে পর্তুগাল। এমনিভাবে সারা বিশ্ব দখল করেছে পরবর্তী সময়ে ইউরোপের প্রায় সবগুলো দেশই। পর্তুগালের লিসবোয়ার বালাম অঞ্চলে সেই বীরদের সারি করে একের ওপর আরেকজনকে সাজিয়ে ভাস্কর্য রয়েছে। কোথায় নেই এই বীরগাথার ভাস্কর্য?
চলার পথে প্রায় ১৬৪ ফুট দীর্ঘ ৬০-৬৪ ফুট প্রস্থের যে বিশ্ব মানচিত্রটি মার্বেল পাথরের ওপর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা মূলত পর্তুগাল কোথায় কোথায় উপনিবেশ স্থাপন করেছে তা লিপিবদ্ধ করে। আপনি হয়তো হাঁটছেন লিসবোয়া থেকে দূরে কোনো ছোট্ট এক শহরে একটি ভাস্কর আপনার দৃষ্টি পড়বে, দেখবেন কোনো এক নাবিকের ভাস্কর্য ও তার যাত্রার বর্ণনা দেওয়া সেখানে। পর্তুগালের মানুষের কাছে নিশ্চয়ই এটি গৌরবের। এতে কোনো লজ্জা নেই। এরা কেউই কিন্তু ভূপর্যটক নন, নাবিক। শখের নাবিক নন, উপনিবেশবাদী নাবিক। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যারা দেশে দেশে গোড়াপত্তন করেছে উপনিবেশ। প্রায় ৫০০ বছর আগে থেকে। সর্বশেষ যেই উপনিবেশটি তারা ছেড়েছে সেটি মাকাও। ১৯৯৯ সালে। স্পেন উপনিবেশ গড়েছে ১৪৯২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত, ফ্রান্স ১৫৩৪ থেকে ১৯৮০, লাতিন আমেরিকার গায়ানা এখনো তাদের দখলে। ডেনমার্কের, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসের সর্বশেষ উপনিবেশ ছিল যথাক্রমে ১৯১৭ ১৯৬২ ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের দৌড়ে জার্মানিকে বলা যায় বাকিদের তুলনায় অনেকটা কিশোর। তার ইতিহাস মাত্র ৩৬ বছরের। যেখানে পর্তুগাল স্পেন ফ্রান্স নেদারল্যান্ডস ডেনমার্ক নরওয়ের প্রায় গড়ে সাড়ে চারশ বছরের উপনিবেশের ইতিহাস। সবচেয়ে কুখ্যাত উপনিবেশ স্থাপনকারী হলো যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এই দেশ দুটি বিশ্বের অন্তত ২৫টি স্থানে এখনো সেই বিগত সময়ের মতো ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। শুভঙ্করের ফাঁকি হচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের মূল দেশ ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মানুষের মতো অধিকার রয়েছে, কিন্তু যদি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে চেনেন এসব স্থানের বাসিন্দাদের মধ্য থেকে তাহলে দেখবেন কত ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার তারা প্রতিনিয়ত। ইউরোপীয়দের নিজেদের ভাগাভাগির সুবিধা ও দখলদারিত্ব সহজ করার জন্য সুবিধামতো আফ্রিকার দেশগুলোর সীমানা তৈরি করেছে তারা। দেখবেন, দেশগুলো যেন ভাগ হয়েছে অনেকটা ইটের টুকরোর মতন। এর কোনোটাই প্রাকৃতিক সীমানা নয়। কোনো জাতিসত্তার বিবেচনা করা হয়নি, যথেচ্ছ ভাগাভাগিতে একই আদিবাসী গোত্রদের বিভাজন করে দুই দেশে ফেলে দিয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন বিরোধী আদিবাসীদের ফেলেছে এক দেশে যাতে বছরের পর বছর এরা পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে আর তার সুযোগে ইউরোপীয়রা নিরাপদে তাদের শাসন করে যেতে থাকে। কার্যত বাকি বিশ্বকে দ্বন্দ্ব-উন্মুখ করে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সভ্যতার মুখোশ পরে চলেছে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীরা শত শত বছর ধরে। এগুলো করেছে তারা অত্যন্ত সুচারুভাবে অনেকটা অভিভাবকীয় কায়দায়।
কে দিয়েছে তাদের এই অভিভাবকত্ব? আজ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা এশিয়ার দেশগুলোতে উপনিবেশ-পরবর্তী যে অস্থিরতা আমরা লক্ষ করি তা মূলত এই উপনিবেশবাদীরই বীজের ফল। সারা বিশ্বে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাবেক উপনিবেশগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে চিরতরে ভেঙে দিয়েছে যখন, এবং অন্যদিকে সারা পৃথিবীর সম্পদ পুঞ্জীভূত করে ফুলেফেঁপে উঠে এরা নিজেরা সমৃদ্ধির চূড়ায়, এটা কি স্বাভাবিক নয় এই ‘সমৃদ্ধি’র ছোঁয়া পেতে ঔপনিবেশিকতায় পিষ্ট দেশগুলোর মানুষগুলো তার আজন্ম দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করবে? ইউকেসহ ইউরোপীয়রা প্রায় ৫০০ বছরের উপনিবেশিক শোষণে ও নিষ্ঠুর নির্মমতায় বাকি বিশ্বকে যেভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে আর যখন সেই পঙ্গু দেশগুলোর মানুষগুলো গত ৫০০ বছরে ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্ত হতে ইউরোপে ভিড় জমাতে চায়, এটি তো মূলত ইউরোপের দ্বারা সৃষ্ট সেই ঔপনিবেশিক বীজ থেকে জন্মানো বৃক্ষের ফল, এখন তারা সেই ফল খেতে চান না, কী আশ্চর্য। ২০০৮ সালে ইতালি প্রথম দেশ, উপনিবেশ স্থাপন ও সেই অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছে লিবিয়ার কাছে এবং পাঁচ বিলিয়ন ডলার অর্থ মূল্যের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা ২০ বছরে পরিশোধযোগ্য। নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে অপরাধের জন্য। যদিও এই ক্ষমা প্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ প্রদান অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ছিল তার বাইরে অনেক দেশে তারা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছে উপনিবেশকালে তাও মাথায় রেখে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো চলে দেরিতে হলেও অন্তত তারা এটি শুরু করেছে বলে। অথচ পর্তুগাল-ইউকে স্পেন ফ্রান্স বেলজিয়াম ডেনমার্কসহ ইউরোপের বাকি দেশগুলো যারা বাকি বিশ্বের মানুষ মানচিত্র সম্পদ ও চরিত্র নিয়ে যেভাবে পেরেছে যথেচ্ছাচার করেছে তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। তাদের নিশ্চয়ই ধারণা আছে যদি তারা তাদের অপকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায় তাহলে কত কোটি কোটি বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ঔপনিবেশিক জাঁতাকলে পৃষ্ট দেশগুলো এখনো এতটা দুর্বল যে সে দাবি তারা করার সাহস করে না। যতদিন ধরে তার ক্ষতিপূরণ না দিচ্ছে ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাচ্ছে, আজ তাদের দেশগুলো যদি আগামী ৫০০ বছরেও সেই সব উপনিবেশ থেকে আসা অভিবাসী দিয়ে ভরে যায়, তাদের অভিযোগ করার কিছু নেই। ‘সভ্য’ ইউরোপীয়রা তাদের পূর্বপুরুষের দ্বারা সৃষ্ট উপনিবেশের সুফল ভোগ করেছে শত শত বছর ধরে, এখন যদি তার কিছুটা কুফল ভোগ করতে হয় অভিবাসীদের ঢালাও আগমনের জন্য এবং তার জন্য তারা কিছুটা অসুবিধায় যদি পড়েন, তাদের চলাফেরা ও জীবনযাপনে কিছুটা যদি বিঘ্ন ঘটে, তা তো তার পূর্বপুরুষদেরই কৃত অপকর্মের তুলনায় যৎকিঞ্চিৎ নয় কি? অথচ উগ্র কট্টরপন্থি দলগুলোর জয় হচ্ছে এসব দেশে। কারা ভোট দিচ্ছে এদের? বর্ণবাদী সাদা চামড়ার মানুষরা নিজেদের দেশগুলোকে ‘স্বর্গ’ করে রেখে বাকি পৃথিবীকে নরক করে তুলেছে। এই নরকে আজ হাহাকার। এই নরকে চলছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পরস্পর হানাহানি, আত্মহনন। এ সব দুর্বিষহ প্রতিকূলতাকে পার করে অভিবাসীরা যখন তাদের বানানো স্বর্গে হাত বাড়ায়, এই হাত তারা ছেঁটে দিতে চায়। কে দিয়েছে তাদের এই ঔদ্ধত্য? কারণ তারা এখনো তাদের ঔপনিবেশিক অপরাধের জন্য ক্ষমা চায়নি। যতদিন না পর্যন্ত তারা ক্ষমা চাইবে, মানবজাতির ইতিহাসে এর চেয়ে বর্বরোচিত বিষয় আর কী হতে পারে? যে জাতি পান থেকে চুন খসলে কথায় কথায় ক্ষমা চায়, প্রকৃতপক্ষে তারা আদতে কথাটা ক্ষমাপ্রার্থী?
লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক লিসবোয়া, পর্তুগাল
