আমরা সবাই জানি যে, মানুষ কেন বিয়ে করে, কখন বিয়ে করে। অনেকের মতে আদর্শ পরিবার গঠন, জৈবিক চাহিদা পূরণ ও মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ হলো বিয়ে। বিয়ে মানুষের জীবনকে মার্জিত, পবিত্র ও পূর্ণতা দান করে। অনেক মহাজন স্ত্রীকে ‘অর্ধাঙ্গিনী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ স্বামী-স্ত্রী মিলিত যুগলই পূর্ণ দেহ। বিয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বয়সের কথা কোনো ধর্মে বলা হয়নি। তবে বাংলাদেশের সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য বিয়ের আইনি বয়স মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর। ১৮ ও ২১ বছরের নিচে কোনো মেয়ে ও ছেলের মধ্যে বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে পরিগণিত হবে। এবং আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে সর্বোচ্চ কত বছর বয়সে বিয়ে করা যাবে তা আইনে বর্ণিত নেই। আমাদের দেশের প্রচলিত সামাজিক বিধান, আইনকানুন অনুসারে কোনো নারী একসঙ্গে দুজন স্বামী রাখতে পারেন না, আর একজন পুরুষ প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারেন না। আইনানুগ বৈধ বিবাহের ফলে স্ত্রী বা স্বামীর স্পাউজ অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রীর সম্পত্তির ওপর মালিকানা থাকে।
আমাদের সমাজে কোনো সরকারি কর্মচারী অবসরপ্রাপ্ত হলেই মনে করেন, অবসর জীবন মানেই তারা অকর্মণ্য। তবে অনেকে অন্য চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করে পেনশনের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও করেন। সরকারি পেনশন থেকে এককালীন যে টাকা পান এবং মাসিক পেনশন থেকে যা পান তাতে তাদের ভালোই চলে যায়। তবে সমস্য হলো, পুরুষ পেনশনার যদি স্ত্রীকে এবং মহিলা পেনশনার যদি স্বামীকে হারান তাহলে স্বামী বা স্ত্রী একা হয়ে নিঃসঙ্গ, একাকিত্ব ও অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করেন। দেশে এখন প্রায় ১০ লাখ পেনশনভোগী আছেন। কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও যদি ধরে নেওয়া যায় যে, এইসব পেনশনভোগীর ১০ শতাংশ বিধবা বা বিপতœীক, তাহলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ। তাদের মধ্যে অনেকেরই সন্তানদের কাছে থাকার সৌভাগ্য হয় না। অনেক দম্পতির সন্তান নেই। অসুস্থ হলে কে তাকে ডাক্তারের চেম্বার বা হাসপাতালে নিয়ে যাবে? কে দেখাশুনা করবে, কার সঙ্গে সময় কাটাবে? কে নিরাপত্তা দেবে? তাই সংগত কারণেই তিনি পুনর্বিবাহ করতে বাধ্য হন। আবার কিশোর বয়সের প্রেম অবসর জীবনে এসে বিয়েতে গড়ায়। অবসর জীবনেও প্রেম-ভালোবাসা হতে পারে এবং পরিশেষে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রেম ভালোবাসার তো কোনো বয়স নেই। আর নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্বকে বিদায় জানাতে বিবাহের পাত্রপাত্রীর বয়সের কোনো গাছপাথর থাকে না। তা হতে পারে, ৬০-৭০ এমনকি ৮০ বছর কোনো পুরুষের, এমনকি নারীরও।
প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীই যে ৫৯ বছর বয়সে অবসরপ্রাপ্ত হয়ে পেনশন পান, তা নয়। অনেকেই চাকরিজীবী স্বামী বা স্ত্রীকে অকালে হারিয়ে পারিবারিক পেনশন পেয়ে থাকেন। ফলে একজন পেনশনার পেনশন পাওয়া অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী বিয়োগের ফলে নিজের দেখাশুনা, সন্তানদের লালন-পালন, একাকিত্ব কাটাতে বিবেচনামতো বিবাহ করতে উৎসাহিত হতেন। কিন্তু ২০১৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নারী বা পুরুষ উভয় ধরনেরই সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পরে বিপত্নীক স্বামী বা বিধবা পতœী আমৃত্যু পারিবারিক পেনশন পাবেন যদি না তিনি পুনর্বিবাহ করেন। অর্থাৎ বর্তমানে পেনশন পাওয়া অবস্থায় কোনো পেনশনার বিবাহ করলে পেনশনারের মৃত্যুর পরে এই বিবাহজাত স্বামী বা স্ত্রী পেনশন পাবেন না। এই প্রজ্ঞাপনটি বেশ কিছু সামাজিক ও মানবিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে : ১. অনেক নারী বা পুরুষ পেনশনভোগী, যারা স্বামী/স্ত্রীকে হারিয়েছেন, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। তাদের অনেকেই নতুন সঙ্গী পেতে চাইলেও, পারিবারিক পেনশন হারানোর আশঙ্কায় বিয়ে করতে ভয় পান। ২. আইনটি একরকমভাবে বয়স্কদের পুনর্বিবাহকে নিরুৎসাহিত করছে, বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে। এতে তারা সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ৩. এই বিধানটি সামাজিক বৈষম্য, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘনের শামিল। একজন নারী বা পুরুষ কি শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তার কারণে সারা জীবন একা থাকবেন? তাই পারিবারিক পেনশন না পাওয়ার ভয়ে অনেক নারী-পুরুষই পুনর্বিবাহ না করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশ সরকারের ২০১৮ সালের পেনশন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের ফলে অনেক বয়স্ক পেনশনার জীবনসঙ্গী পাওয়ার অধিকার হারাচ্ছেন কিংবা সাহস পাচ্ছেন না, যা একটি মানবিক সংকট তৈরি করছে।
সরকার চাইলে কিছু শর্তসাপেক্ষে এই প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তন আনতে পারে, যেমন : ১. পুনর্বিবাহ করলেও পূর্ববর্তী স্বামী/স্ত্রীর নামে প্রাপ্য পারিবারিক পেনশন আংশিক চালু রাখা। ২. নির্দিষ্ট বয়সের পরে (যেমন ৬০+) পুনর্বিবাহ করলে পেনশনপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা। ৩. বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে পেনশন বহাল রাখার সুযোগ দেওয়া।
বাংলাদেশ সরকারের ২০১৮ সালের পেনশন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের পরির্বতন নিয়ে আসলে, পারিবারিক পেনশনভোগী বিবাহ করলে, অন্য একজন নারী বা পুরুষ নিরাপত্তা পেত নিঃসঙ্গতা দূর হতো এবং নিরাপদ আশ্রয় লাভ করত। তাহলে কি রাষ্ট্র বয়স্ক মানুষের বিবাহ করতে নিরুৎসাহিত করছে? হয়তো কোনো অবসরপ্রাপ্ত পেনশনারের সন্তানসন্ততি নেই, বা থাকলেও আছে বিদেশ কিংবা দেশে থাকলেও পিতা-মাতার কাছে থাকার উপায় নেই। এমন অবস্থায় একজন অসহায় পেনশনার কী করবেন? তিনি কি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে উঠবেন? না, তারা সাধারণ মানুষের মতো পারিবারিক জীবন উপভোগ করতে চান। তাই অবসর জীবনকে স্বস্তিময়, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করতে অবসরপ্রাপ্ত নারী-পুরুষদের পুনর্বিবাহ ব্যবস্থা থাকা দরকার। যদিও আমাদের সমাজের সন্তানরা প্রবীণ বাবার বিয়েতে আপত্তি না করলেও, মায়ের পুনর্বিবাহে কিছুতেই রাজি হবেন না।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
