নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে ১০ মাস আগে। এই দীর্ঘ সময়েও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। অথচ এ নিয়োগ দেওয়া হয় সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে। ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ে প্রথম সচিব ও দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের কাজ হচ্ছে পাসপোর্ট ও ভিসা ইস্যু করা। একই সঙ্গে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজে অংশ নেন তারা। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে গত ১০ মাসেও কেন নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়োগসংশ্লিষ্টরা।
যেকোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে মাত্রাতিরিক্ত সময় লাগে। প্রতি বছর যেখানে শেষ করার কথা, সেখানে গড়ে চার বছরে একটা বিসিএস শেষ হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় তরুণদের সোনালি সময় নষ্ট হয়। যখন চাকরিতে ঢুকে দ্রুত বিধিবিধান শেখার কথা, তখন তরুণরা বেকার বসে থাকে। তাদের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়। শুধু বিসিএস নয়, সরকারি দপ্তরের যেকোনো নিয়োগেই দীর্ঘ সময় লাগে। দীর্ঘ সময়ের কোনো পরিমাপ নেই। একটা নিয়োগ কখন শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারে না। খাদ্য অধিদপ্তরের ফুড ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন পদে সর্বশেষ জনবল নিয়োগ দিতে পাঁচ বছর লেগেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও অনেক সময় লেগেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ নিয়োগে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ হিসেবে পছন্দের কর্মকর্তাদের এ পদে বাছাইয়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এখানে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তির পরও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে।
সাধারণ বেকারদের নিয়োগ দিতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে। কারণ তাদের নানা ধরনের তথ্য যাচাই-বাছাই করার বিষয় থাকে। কিন্তু কর্মকর্তাদের সেই জটিলতা থাকে না। তাদের বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকেই জানা সম্ভব বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিয়ম হচ্ছে প্রার্থী বাছাইয়ের পর তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। নেতিবাচক বিষয় না থাকলে তা অনুমোদনের জন্য সরকারপ্রধানের কাছে পাঠানো হবে। অথচ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ছাড়াই প্রার্থীদের পদায়নের তালিকা পাঠানো হয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে। সেই তালিকা ফেরত আসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। দ্বিতীয় দফায় নতুন তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়। তাতেও আপত্তি জানায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। এরপর টেলিফোনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগকে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের আপত্তির কথা জানায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
নিয়োগসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার শ্রম শাখার আপত্তি রয়েছে প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃতদের চারজনের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। ছাত্রজীবনে এই চারজন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরিজীবনে শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ, আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, রাষ্ট্র কর্র্র্র্তৃক নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে কাউকে এসব পদে নিয়োগ দিতে চায় না সরকার। নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া প্রসঙ্গে সাবেক সচিব আব্দুল আউয়াল মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন এই কর্মকর্তারা। ফলে তাদের পদায়নও খুবই বিচার বিশ্লেষণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ১০ মাসেও নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় সরকারের অদক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। এতে এসব পদে কাজ করতে আগ্রহীদের অনিহা তৈরি হবে। এখন কোনো নিয়োগ দিতে গেলেই দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠছে। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে চলে যাচ্ছে।’
গত ৭ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবার ‘অতীব জুরুরি’ একটি চিঠি পাঠানো হয়। বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের কর্মকর্তাদের পদায়নের জন্য প্রাথমিক বাছাইয়ের উত্তীর্ণ ১৫ কর্মকর্তার প্রাক-জীবনবৃত্তান্ত তদন্ত করে ৭ দিনের মধ্যে মতামত দিতে নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি গড়িয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে গত ৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনিকে লেখা এক চিঠিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) মো. এরফানুল হক জানান, ‘ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের কর্মকর্তাদের বৈদেশিক নিয়োগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেষণাদেশ জারির পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। এতদসংক্রান্ত জটিলতা এড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক বিদেশে কর্মকর্তা পদায়নের নিমিত্ত প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের আগেই শৃঙ্খলা (বিভাগীয় মামলা ও দুদক) এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা সমীচীন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি নির্দেশক্রমে অবহিত করা হলো।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের এসব মিশনের কর্মকর্তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বাংলাদেশিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিশনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ক্ষেত্র তৈরিতে অবদান রাখা। দেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা। দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি করা। দেশের সরকারের সঙ্গে সে দেশের সরকারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যস্থতা করা। এ ছাড়া পাসপোর্ট ইস্যু ও কূটনৈতিক বিষয়তো রয়েছেই।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ভ্রমণে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। পরে উপদেষ্টাকে হেনস্তার অভিযোগে জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কাউন্সিলর মুহাম্মদ কামরুল ইসলামকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ করা হয় ।
এ ছাড়াও সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দায়িত্ব থেকে দেশে না ফিরে দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশের বাইরে অন্য দেশে চলে যান মরক্কোতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ হারুন আল রশিদ। সেখানে অবস্থান করেই বর্তমান সরকার ও সরকারপ্রধানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক লেখালেখিও করেন তিনি। সে কারণে এই কূটনীতিক ও তার পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্ট বাতিল করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মরক্কোতে বাংলাদেশের সাবেক এই রাষ্ট্রদূতকে গতবছরের ১১ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন ও অনতিবিলম্বে মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার আদেশ দিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে তিনি তার পদে বহাল থেকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব ত্যাগ করেন। বাংলাদেশে ফিরে আসার পরিবর্তে, তিনি বিভিন্ন অজুহাতে তার যাত্রা বিলম্বিত করেন। মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়াই তিনি মরক্কো থেকে কানাডার অটোয়ায় চলে যান।
৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে নতুন করে পদায়ন শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। গতবছর ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, ইতালি, কানাডা, বাহরাইন, হংকং, দক্ষিণ আফ্রিকা, জর্দানে বাংলাদেশ মিশনের পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের জন্য প্রথম সচিব এবং দ্বিতীয় সচিব পদে ১৯ জনবল চেয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ। ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম সচিব পদের জন্য আবেদনকারীর যোগ্যতা জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডে কমপক্ষে দুই বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমযোগ্যতাসম্পন্ন বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তা এবং দ্বিতীয় সচিব পদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমযোগ্যতাসম্পন্ন বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আবেদন করতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলেছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। তাদের দাবি, ষষ্ঠ গ্রেডে বেতনপ্রাপ্ত হলেও পদমর্যাদায় পাসপোর্ট কর্মকর্তারা না বিসিএস ক্যাডার, না সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যদার। ফলে এ বিশেষায়িত পদগুলোতে তাদের আবেদনের সুযোগ থাকবে না। তারা নোটিস পাঠিয়েছিল সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব বরাবর। কিন্তু নোটিসের সুরাহা না করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
