যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালাহ ও গাজা সিটি এলাকায় আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল রবিবার থেকে ‘মানবিক উদ্দেশ্যে’ এই যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। এ ঘোষণা অনুযায়ী ওই তিন অঞ্চলে প্রতিদিন স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি থাকবে। এদিকে, গাজা উপত্যকায় আকাশ থেকে ত্রাণ ফেলার দাবি করেছে ইসরায়েল। পাশাপাশি দেশটি ত্রাণ সহায়তার জন্য মানবিক করিডর খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তেল আবিব। তবে বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার বিষয়টিতে ‘অদ্ভুত বিভ্রান্তি’ বলে সতর্কতা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও গতকাল সকাল থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ৫৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর আগে শনিবার ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ৭১ জনকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে ৪২ জন ত্রাণের খোঁজে থাকা মানুষ ছিল। এ ছাড়া ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ফ্রিডম ফ্লোটিলার ‘হান্দালা’ জাহাজটি আটক করে ২১ জন ক্রুকে ধরে নিয়ে গেছে ইসরায়েলি সেনারা।
গাজায় ছড়িয়ে পড়া তীব্র খাদ্যসংকট নিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা আন্তর্জাতিক চাপের পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার কিছু অংশে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অভিযান বন্ধ ও নতুন ত্রাণ করিডর চালুর কথা জানিয়েছে। তারা বলেছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালাহ ও গাজা সিটিতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখবে। এই ‘মানবিক বিরতির’ পাশাপাশি খাবার ও ওষুধবাহী ত্রাণবহরের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ রুট সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চালু থাকবে, বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। মিসরের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট টিভি আল-কাহেরা নিউজ জানায়, মিসর থেকে গাজার পথে ত্রাণবাহী ট্রাকের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইসরায়েল আকাশ থেকে গাজার বাসিন্দাদের জন্য ত্রাণ ফেলা শুরু করে।
তবে গাজায় বিমান থেকে ত্রাণ ফেলাকে ‘অদ্ভুত বিভ্রান্তি’ বলে সতর্ক করেছেন ত্রাণ সংস্থাগুলোর নেতারা। এ ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান অনাহারের সংকট নিরসনে কোনোভাবেই কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেছেন তারা। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং জর্ডান আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার পরিকল্পনা করেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার বলেছেন, গাজায় বিমানপথে ত্রাণ পাঠাতে ব্রিটিশ সরকার যা কিছু সম্ভব, সব করছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) কিয়ারান ডনেলি বলেছেন, বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা প্রয়োজনীয় পরিমাণ বা গুণগত মানের ত্রাণ সরবরাহ করতে পারে না। শতাধিক আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করেছে, গাজায় ব্যাপক অনাহার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার বিষয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে মূলত স্থলপথে ত্রাণ প্রবেশ ব্যর্থ হওয়ার কারণে।
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো বলেছিল, মার্চে ইসরায়েল গাজায় সব ধরনের ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পর খাবার ফুরিয়ে আসায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটির ২২ লাখ লোকের বেশিরভাগই তীব্র অনাহারে ভুগছে। গত মে মাসে ইসরায়েল সীমিত আকারে ত্রাণ সরবরাহের পথ খুলেছিল, কিন্তু তাতেও দেওয়া হয়েছিল অনেক বিধিনিষেধ। ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৯ হাজার ৭৩৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৭ জন আহত হয়েছে।
এদিকে, গাজায় জাতিসংঘের ত্রাণ লুটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের কিছু সেনা কর্মকর্তা । ইসরায়েল বহুদিন ধরে দাবি করে আসছিল, হামাস জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ত্রাণ চুরি করছে। এই অভিযোগকে সামনে রেখেই তারা সেখানে খাদ্য সরবরাহে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, জাতিসংঘ পরিচালিত ত্রাণব্যবস্থা ছিল তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য এবং সেখানে হামাসের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা ছিল কম। কারণ জাতিসংঘের কর্মকর্তারা নিজেরাই সরবরাহ ও বিতরণ করত, তৃতীয়পক্ষের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। তার বলেছেন, জাতিসংঘের ত্রাণব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা থাকলেও তা মূলত কার্যকর ছিল এবং ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছেছিল।
