রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট নিয়ে দুর্নীতির ৬ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে তাদের সন্তানসহ ২৩ জনের বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার পৃথক দুই বিশেষ জজ আদালত। একইসঙ্গে ছয় মামলায় সব আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তিন মামলায় শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন অভিযোগ গঠন করে আগামী ১১ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আদেশ দেয় আদালত। অপর তিন মামলায় অভিযোগ গঠন করে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক রবিউল আলম সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১৩ আগস্ট দিন ধার্য করেন। তিন মামলায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিককে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ১৬১/১৬৩/১৬৪/৪০৯/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, ৪০৯ ধারায় সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির অপরাধজনক বিশ^াসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন সাজা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের সাজার বিধান রয়েছে।
হাসিনা পরিবারের বাইরে আরও যে ১৬ আসামি আছেন তারা হলেন, জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) নুরুল ইসলাম, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী, পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, উপ- পরিচালক হাফিজুর রহমান, হাবিবুর রহমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন।
মামলায় অভিযোগে দুদক বলেছে, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে। প্লটের অযোগ্য হলেও তারা পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ নেন।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। আন্দোলন দমনে হাজারের বেশি মানুষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। ব্যাপক হত্যাকা-ের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আগামী ৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই প্রথম দুর্নীতির অভিযোগে মামলার বিচার শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি প্রথম কোনো ফৌজদারি মামলার বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দেশের বাইরে রয়েছেন।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গত ডিসেম্বরে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। ১৩ জানুয়ারি শেখ রেহানা, তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলাটি করে দুদক। পরে ১৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক। এই ছয় মামলার প্রতিটিতেই শেখ হাসিনাকে আসামির তালিকায় আছেন। অন্য আসামিদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিক মামলায় আসামি হিসেবে আছেন। সব মিলিয়ে ছয় মামলার আসামির সংখ্যা ২৩।
দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৬টি মামলায় শতাধিকের বেশি সাক্ষী রয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দুটি তারিখে মামলার বাদী সাক্ষ্য দেবেন। তিনি বলেন, আসামিদের সবাই এখন পর্যন্ত পলাতক। এর মধ্যে কয়েকজন আসামি বিদেশে রয়েছেন। আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিদের গ্রেপ্তার করতে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। অভিযোগ গঠনের আগে আসামিদের হাজির হয়ে বিচারের মুখোমুখি হতে গেজেট নোটিফিকেশন হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার বা হাজির হননি।
দুদকের আইনজীবী আরও বলেন, ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের (মৃত্যুদন্ড) মামলায় কোনো আসামি পলাতক থাকলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী শুনানি করেন। এখানে যেহেতু মৃত্যুদন্ডের সাজা নেই তাই পলাতকদের পক্ষে কোনো আইনজীবী নিযুক্ত করা হচ্ছে না।’
অভিযোগে বলা হয়, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর সড়কের আশপাশের এলাকায় শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা এবং তার ছেলে-মেয়ে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকের নামে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ১০ কাঠার প্লট (প্লট নম্বর ০০৯) বরাদ্দ পেয়েছেন যা ২০২২ সালের ৩ আগস্ট তার নামে বরাদ্দপত্র দেয় রাজউক।
এ ছাড়া শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় (প্লট নম্বর ০১৫) এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদও (প্লট নম্বর ০১৭) ১০ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন। জয়ের প্লটের বরাদ্দপত্র দেওয়া হয় ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর। আর পুতুলের প্লটের বরাদ্দপত্র দেওয়া হয় একই বছরের ২ নভেম্বর। এ ছাড়া শেখ রেহানার নামে ১০ কাঠার প্লট (প্লট নম্বর ০১৩), তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের (প্লট নম্বর ০১১) এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের (প্লট নম্বর ০১৯) নামেও একই পরিমাণের (১০ কাঠা) প্লট বরাদ্দপত্র বিভিন্ন সময় দেওয়া হয়েছে।
