নিজে অর্থ লুটে অন্যদের ফাঁসাতেন শিক্ষা কর্মকর্তা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০৮:১৩ এএম

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন। টানা সাড়ে পাঁচ বছর ধরে একই কর্মস্থলে। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জিম্মি করে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি গত কয়েক বছরে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তার নীতিবিরোধী নির্দেশের বিরোধিতা করায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। দুর্নীতির প্রমাণসহ শিক্ষা অধিদপ্তরে অভিযোগ জানানোর পরও হেলাল উদ্দিনের বদলি ছাড়া কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভুক্তভোগী শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনায় অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন অনুসারে, গত ১৭ জুলাই হেলাল উদ্দিনকে সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ থেকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদে বদলি করা হয়। তবে বদলির আদেশের পরও তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করেননি এবং ২১ জুলাই ৩৫১ নম্বর বিল-ভাউচারে তার অনুসারী জোড়গাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামের নামে ৭ লাখ ২ হাজার ৭৭৪ টাকার ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্সের অস্বাভাবিক বিল অনুমোদন করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম ২০০১ সালে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (সিএনএড) কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং তিনি কখনো ডিপিএড কোর্স করেননি। তবু গত ২৪ জুলাই তার নামে ভুয়া ভাউচারে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করা হয়। নজরুল নিজেও ভুয়া ভাউচারে অর্থ উত্তোলনের কথা স্বীকার করেছেন।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিপিএড কোর্স আমি করিনি, তবে সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধ করতেই আমি টাকা তুলেছি। সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমাও দিয়েছি। সবকিছু নিয়ম মেনে হয় না।’

শিক্ষা কর্মকর্তা কেন তার নামে ভুয়া বিল দিলেন, এমন প্রশ্নে নজরুল বলেন, ‘কিছু শিক্ষক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন। তাই মানবিক কারণে, এখতিয়ারের বাইরে হলেও আমি অর্থটি আমার অ্যাকাউন্টে নিয়েছি।’

হেলাল উদ্দিনের স্বাক্ষরিত বিল-ভাউচারে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের ভ্রমণ ভাতা বাবদ উত্তোলন করা হয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, কয়েকজনকে নামমাত্র কিছু টাকা দিয়ে তার কয়েকগুণ বেশি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

চোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম, শালিখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম, সোনাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জসিম উদ্দিনসহ অন্তত ১৫ শিক্ষক অভিযোগ করেন, ভ্রমণ ভাতার কোনো বিল বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়নি। রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর নিয়ে সামান্য টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভুয়া ভাউচারে বিপুল অঙ্কের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, যা তারা পরে জানতে পেরেছেন। তারা আরও বলেন, শিক্ষা অফিসের দুটি মোটরসাইকেলের জন্য একই অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ভুয়া বিল-ভাউচারে জ্বালানি ও মেরামত বাবদ বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করেছেন হেলাল উদ্দিন। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এসব প্রমাণিত হবে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলতাব হোসেন বলেন, সরকারি নির্দেশনা ছাড়াই আগের সরকারের সময়ে উপজেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে স্লিপ ফান্ডের টাকা থেকে শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে বাধ্য করা হতো। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিম্ন মানের, বিতর্কিত ও শিশুদের পাঠের জন্য অনুপযোগী পুস্তক কিনতে বাধ্য করেন হেলাল উদ্দিন। বই সরবরাহের আগে স্লিপ ফান্ড থেকে সমন্বয়ের মৌখিক নির্দেশনায় ১৭৮টি বিদ্যালয় থেকে প্রতি বিদ্যালয়ে ৩ হাজার টাকা হারে ৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা জোরপূর্বক আদায় করা হয়। কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বই নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এমনকি একজন শিক্ষককে শিক্ষা অফিসের ভেতরে তার অনুসারীদের দিয়ে মারধরও করা হয়। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েও তারা বিচার পাননি।

অভিযুক্ত হেলাল উদ্দিন দাবি করেন, অনৈতিক আবদারে প্রশ্রয় না দেওয়ায় শিক্ষকরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। তিনি বলেন, বই কেনার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এটি তৎকালীন ইউএনও ও কয়েকজন শিক্ষক করেছেন। নজরুল ইসলামের বিলে আমি স্বাক্ষর করিনি। জাল স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কতিপয় শিক্ষক নেতা আক্রোশের কারণে আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর বলেন, ‘সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগের তদন্ত চলছে। ঢাকা থেকেও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত