মধ্যযুগে বাংলায় এক সম্ভ্রান্ত বণিক ছিলেন, তার নাম গৌরী সেন। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট দানবীর, দুহাতে টাকা ছড়াতেন। ঋণমুক্তি, রাজকর অনেক কিছুর জন্যই লোকে গৌরী সেনের দ্বারস্থ হতেন, তিনি কাউকেই খালি হাতে ফেরাতেন না। তার নামের সূত্র ধরেই বাংলা প্রবাদ ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’-এর জন্ম। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও যেন একুশ শতকের গৌরী সেন। বিপিএলে দল মালিক কোচের টাকা দিতে পারেন না, হোটেলের বিল দিতে পারেন না, সব খরচই দিয়ে দেবে বিসিবি! শুধু তাই নয়, এমন অন্যায় আবদার না মেটানোয় উল্টো অপবাদও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিসিবির ঘাড়ে।
রবিবার ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছিলেন বিপিএলের সবশেষ আসরের রানার্সআপ দল চিটাগং কিংস ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক সামির কাদের চৌধুরি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সামির বলেছেন, বিপিএলকে বেশি বিতর্কিত করেছে বিসিবি, ‘৪৬ কোটি টাকা বকেয়া আছে এজন্য। সকালেও আমার সঙ্গে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। উনি আমাকে এনশিওর করেছেন এটা শিগগিরই লিগ্যাল টিমের সঙ্গে বসে সমাধান করবে। আমিও বলেছি, আমি আমার লিগ্যাল টিম ছাড়া বসব না।’ আইনি প্রক্রিয়ার শরণাপন্ন হয়ে সময়ক্ষেপণ করে দীর্ঘদিন ধরেই বিসিবি এবং ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফদের পাওনা না দেওয়ার অভিযোগ সামির কাদেরের বিরুদ্ধে। তার দল চিটাগং কিংসের কোচ ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার শন টেইট। পরে এই পেসারকে বাংলাদেশ জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিসিবি। ৯ আগস্ট শনিবার বিসিবির পরিচালকদের সভাশেষে মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ মিঠু জানিয়েছেন, চিটাগং কিংসের কাছে শন টেইটের পাওনা টাকা দিয়ে দেবে বিসিবি, ‘শন টেইটের টাকা অ্যাডজাস্ট করে দেব।’ ১২৩ টাকা করে মার্কিন ডলার হিসাবে শন টেইটের ৩৭ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৪৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা, সেটা এখনো বকেয়া রেখেছে চিটাগং কিংস। বিপিএলের সময় চিটাগং কিংসের খেলোয়াড়দের রাখা হয়েছিল ঢাকায় হোটেল শেরাটন ও সিলেটে হোটেল রোজভিউতে। এই দুই হোটেলের ভাড়া যথাক্রমে ১৪ লাখ ২৭ হাজার ১০৭ টাকা ও ১৭ লাখ টাকা বকেয়া আছে চিটাগং কিংসের কাছে। এর বাইরেও সরাসরি সই করানো দেশীয় ক্রিকেটার শরিফুল ইসলামের ১০ লাখ টাকা, সরাসরি সই করানো দুই বিদেশি গ্রাহাম ক্লার্ক ও থমাস ও’কোনেলের পাওনা ৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং স্থানীয় টিম ম্যানেজমেন্ট স্টাফদের ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা বকেয়া আছে চিটাগং কিংসের।
বিপিএলের সবশেষ মৌসুমে রানার্সআপ হওয়া কিংস প্রাইজমানি ও টিকিট বিক্রির আয়ের অংশ মিলিয়ে পেয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ টাকা, সেখান থেকে হোটেল ভাড়া ও খেলোয়াড়দের আংশিক পারিশ্রমিক ও অন্যান্য খরচ, যা ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে বিসিবি পরিশোধ করেছে, সেসব কেটে রেখে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির পাওনা দাঁড়িয়েছিল ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সেখান থেকে ড্রাফট থেকে নেওয়া স্থানীয় ক্রিকেটারদের পাওনা পরিশোধের পর কিংসের পাওনা দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কোচের বকেয়া, সরাসরি সই করানো খেলোয়াড়দের বকেয়া ও ম্যানেজমেন্ট স্টাফ এবং হোটেল বিল মিলিয়ে চিটাগং কিংসের এখনো পর্যন্ত যেসব বকেয়ার হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে বোর্ডের কাছে তাদের পাওনা তো থাকেই না উল্টো ৬৭ লাখ টাকার বেশি বকেয়া তাদের।
জুনের ৩ তারিখে বিসিবি থেকে পাঠানো ই-মেইলে বিপিএলের আয়-ব্যয়ের একটি খতিয়ান জানানো হয়। তাতে দেখা যায়, অংশ নেওয়া সাত ফ্র্যাঞ্চাইজির চারটিই তাদের নির্ধারিত ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি পরিশোধ না করেই বিপিএলে অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে সম্পূর্ণ ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি পরিশোধ করেই দলের মালিকানা পেতে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে বার্ষিক চুক্তি থাকে। তবে বিপিএলের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি প্রদান না করে দল নামিয়ে পরে লাভের অঙ্ক থেকে সমন্বয় করে নেওয়ার উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি নেই। শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি নয়, দুর্বার রাজশাহীর হোটেল ও বাসভাড়ার দায়িত্বও নিয়েছে বিসিবি। দুর্বার রাজশাহী দলের ড্রাফট থেকে নেওয়া দেশীয় খেলোয়াড়, সরাসরি সই করা দেশি এবং বিদেশি খেলোয়াড়, কোচ, স্থানীয় টিম ম্যানেজমেন্ট স্টাফ, হোটেল ভাড়া, এমনকি দলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের বহনকরা মাইক্রোবাসেরও ভাড়া বাকি! এই ব্যাপারে বিসিবি পরিচালক ইফতেখার আহমেদ বলেছেন, ‘লাস্ট ইয়ারের বিপিএল আমরা তো আমাদের অকশনের প্লেয়ারদের বা তাদের পেমেন্ট মোটামুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন যেটা হচ্ছে যে, এর পরেরটা অর্থাৎ ডিরেক্ট সাইনিং, কোচেস অ্যান্ড আদার এক্সপেন্সেস, এসব অভিযোগও আমরা পাচ্ছি। এটা আমাদের জন্য খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতি। কিছু কিছু টাকা আমরা অ্যাডজাস্ট করে দেব। রাজশাহীর হোটেলের টাকা, যখন তারা ছাড়ছিল না, আমাদের ফরমার প্রেসিডেন্ট উনি বলে কথা দিয়ে ছাড়িয়ে ছিলেন। সো সেগুলোও আমাদের কাছে রেসপন্সিবিলিটি আসে। আমরা মনে করি সেগুলো আমাদের দেওয়া উচিত। ডিসিশন হয়েছে যে, ডিরেক্ট সাইনিং প্লেয়ার এবং কিছু কিছু পেমেন্ট আমরা আমাদের কাছে যেটুক আছে, আর প্লেয়ারদের টাকাও আমরা দিয়ে দেব, আর পরে ওদের ইয়ে থেকে রিয়েলাইজ করে নেব।’
বিসিবির মিডিয়া কমিটির পরিচালক যদিও বলছেন ‘পরে ওদের ইয়ে থেকে রিয়েলাইজ করে নেব’, আসল কথা হচ্ছে যেসব ফ্র্যাঞ্চাইজি এসব অপকর্ম ঘটাচ্ছে তাদের টিকিটিও ছোঁয়ার সাধ্য নেই বিসিবির। কেউই জমা দেয়নি ব্যাংক গ্যারান্টি। ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, কেউ বা আশ্রয় নেবেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। বিসিবি যদিও ঘোষণা দিয়েছে আইনি লড়াইতে যাওয়ার, তবে সেসবে যে “ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাবে” সেটা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি নিয়ে ভারতীয় ক্রীড়া সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান নিম্বাস স্পোর্টসের সঙ্গে ৫৬.৮৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছিল বিসিবি। কিন্তু চুক্তি ভঙ্গ ও নানান জটিলতায় দুই তরফের আইনি লড়াই ঠেকে সিঙ্গাপুরের আদালতে। নিম্বাস দেউলিয়া হয়ে যাওয়াতে পাওনা ২২ মিলিয়ন ডলার আর আদায় করতে পারেনি বিসিবি, উল্টো আইনজীবীর ফি হিসেবে গুনতে হয়েছে বিস্তর অর্থ। বিপিএলে পাওনা বকেয়া রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইতেও ফল এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম। যার প্রমাণ, ২০১২ ও ২০১৩ সালের বকেয়াই চিটাগং কিংসের কাছ থেকে এখনো আদায় করতে না পারা!
বিসিবির কোষাগারে যে হাজার কোটি টাকা, তার মালিক পরিচালকরা নন। তারা রক্ষক। এই টাকাটা আসে ক্রিকেটাররা আইসিসি বা এসিসির টুর্নামেন্টে অংশ নিলে, ঘরোয়া সিরিজের সম্প্রচার স্বত্ব, জার্সি স্পন্সর, টাইটেল স্পন্সরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে, আর আইসিসির বার্ষিক তহবিলের অংশ থেকে। তবে যেভাবে ‘ক্রিকেটকে ভালোবেসে আসা’ তথাকথিত ফ্র্যাঞ্চাইজিদের রেখে যাওয়া বকেয়া বিসিবির তহবিল থেকে পরিশোধ করছে, তাতে মনেই হতে পারে, বিসিবি যেন এই যুগের গৌরী সেন।
