লোহার স্ক্র্যাপেই মিলছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ!

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২৮ এএম

আমদানি করা লোহার স্ক্র্যাপেই মিলছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ! প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিন দফায় এমন তেজস্ক্রিয় পদার্থ এসে থাকে। তবে তেজস্ক্রিয়তা কখনো ধ্বংস হয় না বলে এসব পদার্থ সংরক্ষণ করা হয়। চিকিৎসা বর্জ্য বা বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত বা প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন যন্ত্রাংশে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থের টুকরোগুলো স্ক্র্যাপ লোহার সঙ্গে মিশে গিয়েই বিপত্তি তৈরি করে। দেশের লৌহ ও স্টিল মিলগুলোতে আমদানি করা এসব স্ক্র্যাপ লোহা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন স্ক্র্যাপ লোহা আমদানি করে ইস্পাত ও রড তৈরি করে ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের চার নম্বর জেটিতে তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণের ব্যবস্থা ‘মেগাপোর্ট ইনিশিয়েটিভ রেডিয়েশন ডিটেকটিভ সিস্টেমে’ একটি কনটেইনারে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকার বিষয়টি শনাক্ত হয়। ব্রাজিলের মানাউস বন্দর থেকে আসা কনটেইনারটিতে স্ক্র্যাপ লোহা ছিল। কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, তেজস্ক্রিয় পদার্থ শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি এবারই প্রথম নয়। প্রতি বছর এমন প্রায় দুই থেকে তিন দফায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায়। তবে বেশিরভাগ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায় আমদানি করা স্ক্র্যাপ লোহার সঙ্গে। চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১০ সাল থেকে মেগাপোর্ট ইনিশিয়েটড রেডিয়েশন ডিটেকটিভ সিস্টেম চালু হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই এমন পদার্থ পাওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানান চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমান। তিনি গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো পদার্থের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় পদার্থ শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ পারমাণবিক কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লেখা হয় এবং সেখান থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল এসে তেজস্ক্রিয় পদার্থটি শনাক্ত করে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবস্থা করেন।

এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ কী করা হয় জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন চট্টগ্রামের পরিচালক ড. শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘তেজস্ক্রিয় তো ক্ষতিকর নয়। আমরা প্রতিনিয়ত এসব পদার্থ ব্যবহার করি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ কত মাত্রার। এগুলো মানবসৃষ্ট কি না? হাসপাতালে ক্যানসার থেরাপিতে এবং অন্যান্য সরঞ্জামেও কিন্তু তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে।’

তাহলে বন্দরে শনাক্ত হওয়া তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোর ভবিষ্যৎ কী? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞ টিম তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো পরীক্ষা করে কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে এবং কত মাত্রার রয়েছে, তা বের করে। পরে ক্ষতিকর মাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো ঢাকার সাভারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পৃথক একটি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানেই সংরক্ষণ করা হয়।’

ধ্বংস করা যায় না তেজস্ক্রিয় পদার্থ : শনাক্ত হওয়া তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোর মাত্রার ওপর ভিত্তি করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে বলে জানান সাভারে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খোন্দকার আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোর মাত্রা ও অর্ধেক জীবনের ওপর ভিত্তি করে এগুলো সংরক্ষণ করা হয়। তেজস্ক্রিয় পদার্থ কখনো ধ্বংস করা যায় না।

অর্ধেক জীবন কী? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে একাধিক পরমাণুবিজ্ঞানী জানান, বন্দরে সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া কনটেইনারটিতে থোরিয়াম-২৩২, রেডিয়াম-২২৬ ও ইরিডিয়াম-১৯২-এর উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। থোরিয়াম-২৩২-এর অর্ধজীবন ১৪ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ ১৪ বিলিয়ন বছর এখানে যে শক্তি রয়েছে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থেক হয়ে যাবে। পরে ১৪ বিলিয়ন বছর পর আরও অর্ধেক হবে এবং একসময় এর শক্তি শূন্যতে চলে আসবে। রেডিয়াম-২২৬-এর অর্ধজীবন ১৬০০ বছর এবং ইরিডিয়াম-১৯২-এর অর্ধজীবন ৭৪ দিন।

এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ কোথায় রাখা হয়? এই প্রশ্নের জবাবে ড. খোন্দকার আসাদুজ্জামান বলেন, এসব পদার্থ আমরা তীব্রতা বুঝে নির্ধারিত কক্ষে সংরক্ষণ করে রাখি।

বন্দরে শনাক্ত হওয়া কনটেইনারগুলোতে কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায় এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে পরমাণুবিজ্ঞানীরা জানান, থোরিয়াম-২৩২, রেডিয়াম-২২৬, ইরিডিয়াম-১৯২, সিজিয়াম-১৩৭, এমআরসিআম বেরিলিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায়। তবে এবার শনাক্ত হওয়া কনটেইনারটির অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় বস্তুর মাত্রা সত্যিকার অর্থে কত এবং কোন ধরনের পদার্থ রয়েছে, তা পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। এজন্য কনটেইনারের ভেতরে থাকা বস্তুগুলো বের করে তেজস্ক্রিয় পদার্থটি শনাক্ত করার পর এর শক্তিমত্তা ও কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ, তা নির্ধারণ করা যাবে। আর তা করবে পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা।

তেজস্ক্রিয় পদার্থ দেশে প্রবেশ করে কীভাবে? : পরমাণুবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ^ জুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে স্ক্র্যাপ লোহা আমদানি করে দেশের স্টিল মিলসগুলো। কখনো কখনো তেজস্ক্রিয় পদার্থে নির্মিত চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো কোনো না কোনো দেশের নাগরিক ভেঙে বাইরে ফেলে দেয়। ভাঙাড়ি দোকানগুলো তা লোহার টুকরো হিসেবে লোহার পাতের সঙ্গে বিক্রি করে দেয়। এই লোহার পাতের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় পদার্থের টুকরো মিশে গিয়ে তা অনেক দেশে রপ্তানি হয়। আর তখনই বন্দরের স্ক্যানিং মেশিনে তা শনাক্ত হয় এবং সেখান থেকে তা পৃথক করা হয়। এই পৃথকীকরণের কাজ কীভাবে করা হয়, জানতে চাইলে ড. খোন্দকার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞ টিম ডিটেকটর দিয়ে অন্যান্য লোহার টুকরো থেকে তেজস্ক্রিয় থাকা টুকরোটি সরিয়ে ফেলে এবং সাভারে নিয়ে এসে আমরা সংরক্ষণ করি।’

এ বিষয়ে কথা হয় দেশের অন্যতম রড নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘আমরা আমেরিকা, জাপান, ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নত ও অনুন্নত দেশ থেকে স্ক্র্যাপ লোহা আমদানি করি। মূলত চিকিৎসা আইটেমের সঙ্গে অনেক সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থের টুকরো অনিচ্ছাকৃতভাবে চলে আসে। যা পরবর্তীকালে বন্দরের স্ক্যানিং মেশিনে শনাক্ত হয়।’

শনাক্ত হওয়া তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘তেজস্ক্রিয় পদার্থ নাম দিয়ে কেউ কোনো পণ্য আমদানি করতে পারে না। তবে আমদানী করা স্ক্র্যাপ লোহার সঙ্গে অনেক সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেলে পরমাণু শক্তি কমিশনের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা এগুলো নিয়ে যায় এবং তারাই সংরক্ষণ করে। এতে বন্দর কখনো ঝুঁকিতে পড়ে না।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিভিন্ন সময়ে আসা কনটেইনারগুলোর মধ্যে ১৩টি কনটেইনারে তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে বলে সন্দেহ করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সর্বশেষ কনটেইনারটির মধ্যে কত মাত্রার এবং কী পরিমাণে কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে, তা শনাক্ত করতে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশনের একটি টিম মাঠে নামছে। অবশিষ্ট ১২টি কনটেইনারের মধ্যে ২টি কনটেইনার খালি ও ১০টির মধ্যে পণ্য রয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, “আমাদের কাছে থাকা তালিকা অনুযায়ী সর্বমোট ১৩টি কনটেইনার ‘মেগাপোর্ট ইনিশিয়েটিভ রেডিয়েশন ডিটেকটিভ সিস্টেমে’-এর আওতাধীন এলাকার মধ্যে সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এসব কনটেইনার নিয়ে পারমাণবিক শক্তি কমিশনের রিপোর্টের আলোকে চট্টগ্রাম কাস্টমস সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।”

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মারুফুর রহমান বলেন, ‘বন্দরের ইয়ার্ডের ভেতরে থাকা আগের ১২টি কনটেইনারের ইনভেন্ট্রি সম্পন্ন করে নিলামে বিক্রির জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা হয়েছে। এসব কনটেইনার থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ অনেক আগেই পৃথক করে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারপরও আমরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবারও পরমাণু শক্তি কমিশনের কাছে চিঠি লিখেছি কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে কি না, চেক করার জন্য। পরমাণু শক্তি কমিশনের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত পেলেই এগুলো নিলামে বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কাস্টমস।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত