আধুনিক চিকিৎসা নাকি নির্মমতা?

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৫, ১২:৫৭ এএম

সেকালের কথা মনে করুন সন্তান জন্ম নিত খড়ের ঘরের কোণে, কাদার মেঝেতে, খোলা আকাশের নিচে। তখন মা যন্ত্রণায় বুক কামড়ে কষ্ট সহ্য করতেন, তবু হাসতেন। জানতেন, এই যন্ত্রণার মধ্যে লুকিয়ে আছে, জীবনের পবিত্র আশীর্বাদ মাতৃত্ব। আজ তা অনেক দূরে, কিন্তু মায়ের যন্ত্রণা কি কমেছে? আমাদের হাসপাতালগুলো কি ‘মা’ তৈরি করে, নাকি পণ্য বানায়? কেন এত বেশি সিজার? এটা কি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, না নীরব মুনাফা খেলা? আজ মা হওয়ার আগে প্রথম চিন্তা, হাসপাতালের বিল! মা হওয়ার যন্ত্রণাকে আমরা ব্যবসায় রূপান্তর করেছি। চিকিৎসক চান নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চা জন্ম হোক, রোগী চায় ব্যথা কম। যেন মা হওয়ার আনন্দ নয়, এক প্রকার সøট বুকিং! এই প্রশ্ন থেকে আমরা পিছু হটতে পারি না সিজার কি মানবতার জয়, নাকি মুনাফার মহামারী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি দেশের মোট ডেলিভারির মাত্র ১০-১৫ শতাংশ সিজার হলে তাও স্বাভাবিক ধরা যায়। এই হার উন্নত বিশ্বের হলে, বাংলাদেশে আরও কম হওয়ার কথা। অথচ বাংলাদেশে এই হার এখন প্রায় ৪০ শতাংশ, অনেক জেলায় তা ৭০ শতাংশের কাছাকাছি! এটি কি কেবল প্রয়োজনীয়তার ফল? উত্তর : একেবারেই না। কারণ এটি অসাধু ব্যবসা ও অর্থের ফাঁদ! আমরা মানি, কিছু ক্ষেত্রে সিজার জরুরি কারণ জরায়ুর জটিলতা, বাচ্চার অবস্থান বা মা’র শারীরিক জটিলতার কারণে সিজার ব্যাধতামূলক হয়ে যায়। কিন্তু এখন সিজার হচ্ছে অপ্রয়োজনে। কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল সিজারকে বাণিজ্যিক পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। আমরা এমন একটা বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ‘ভয়ের চিকিৎসা’ রোগীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে, বিভ্রান্ত করে তাদের ব্যথাহীন আধুনিকতার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, অথচ সেটিই হতে পারে ভবিষ্যতের শারীরিক জটিলতার বীজ। অসাধু চিকিৎসকদের একটি অংশ সময় বাঁচাতে এবং আয় বাড়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে সিজারের পথে হাঁটছেন। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের একজন প্রধান হিসেবে, লন্ডনে কর্মরত দুই চিকিৎসক ছেলে-মেয়ের পিতা হিসেবে, একজন বিবেকবান নাগরিক হিসেবে বলছি, জাতিকে আমরা কীভাবে তৈরি করছি? টাকা আর সময় এই দুয়ের চাপে আমরা বিক্রি করে ফেলছি মাতৃত্ব? কই, সিজারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তো দেখি না?

ব্যথাহীন মা হওয়াকে, আধুনিকতা ভাবা হয়। তার পরিবারও চায় নিরাপদ ‘অপারেশন’। চিকিৎসকও সময় বাঁচাতে চান, হাসপাতালের আয় বাড়াতে চান। সবাই মিলে মায়ের পেট কেটে সন্তান আনতে ব্যস্ত। কারণ, ওটাই এখন ‘স্মার্ট মাদারহুড’! এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা আছে। একটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান হিসেবে মাঝেমধ্যে রোগী বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে সরাসরি ফোনকল আসে। তবে এক রাতের অভিজ্ঞতা আমার হৃদয়ে বিশেষ ছাপ রেখে গেছে। রাত তখন প্রায় দেড়টা। হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনের ওপাশে একজন পিতা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার, আপনার হাসপাতালে তো সিজার করার ডাক্তার নেই। আমার মেয়ের সিজার করতে বলেছি, করছে না।’ আমি শান্ত স্বরে জানতে চাইলাম, ‘আপনার রোগীর নাম কী? কত নম্বরে ভর্তি?’ তিনি উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। জানতে পারলাম, এটি একটি স্বাভাবিক প্রসবের কেস এবং প্রসবের একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে- সিজারের প্রয়োজন নেই। পরবর্তী সময়ে রোগীর অভিভাবককে আবার ফোন দিলাম এবং জানালাম, ‘এটি একটি স্বাভাবিক ডেলিভারি কেস, সিজারের প্রয়োজন নেই। আপনাকে কে বলেছে সিজার করতে?’ আমার গাইনি বিভাগের চিকিৎসক, এনেস্থেসিয়া ডাক্তার সবই তো হাপাতালে আছে। তিনি কিছুটা রাগের সঙ্গে বললেন, ‘মেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, আমরা সিজার চাই।’ এবার আমি একটু দৃঢ় হলাম, ‘আমার হাসপাতালে ইচ্ছামতো সিজার করার ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজন ছাড়া সিজার করা অনৈতিক এবং অমানবিক। আপনি চাইলে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেন, আমাদের অ্যাম্বুলেন্স রেডি আছে।’

আধা ঘণ্টা পরে আবার সেই পিতার কল। এবার তার কণ্ঠে উত্তেজনা ও আনন্দ। তিনি জানালেন, ‘স্যার, আমার নাতি হয়েছে!’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সিজারে?’ তিনি হেসে বললেন, ‘না, স্বাভাবিক ডেলিভারিতে।’ আমি তখন বললাম, ‘দেখলেন তো, অকারণে সিজার করালে কত বড় ক্ষতি হতো যা অর্থনৈতিক, শারীরিক এবং মানসিক। আপনার মেয়েও একটি অপারেশন থেকে বেঁচে গেল। মনে রাখবেন, সিজার অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন ছাড়া এটি করা প্রতারণা। আপনি একজন অভিভাবক হিসেবে অন্যদেরও এই বার্তাটি পৌঁছে দিন’ কথাগুলো বলে আমি ফোন রেখে ঘুমাতে গেলাম একটা অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে। যে মা সন্তান জন্ম দিয়ে মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসতেন আজ তার কষ্টকে বলি, ‘অনাবশ্যক’। যা প্রকৃতির নিয়ম, তা-ই এখন বাণিজ্যিক নিয়মে চলছে। এখন সন্তান জন্ম মানেই যেন সিজারিয়ান সেকশন! নরমাল ডেলিভারি যেন দিন দিন বিলুপ্তপ্রায় এক চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিণত হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি : বর্তমানে নানা অজুহাতে অনেক সময় অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান অপারেশনের পথে হাঁটা হচ্ছে। অথচ এর রয়েছে অনেক স্বাস্থ্যগত ও আর্থিক ঝুঁকি, যা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। প্রথমত, একটি সিজার মানেই মায়ের দেহে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে কাটা-ছেঁড়া। একবার নয়, বারবার এমন অস্ত্রোপচার ভবিষ্যতে গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে প্রসব না হলে শিশুর ফুসফুস পূর্ণ বিকাশে সময় পায় না, ফলে জন্মের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারে জন্ম নেওয়া শিশুদের ভবিষ্যতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়াও, সিজারের পর ব্যথা, ইনফেকশন, জটিলতা এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে সুস্থ হতে হয়। অন্যদিকে, এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত হাসপাতাল ব্যয়, অপারেশন খরচ, ওষুধের খরচসহ নানা আর্থিক চাপ। সব মিলিয়ে বলা যায়, সিজার একটি জীবন রক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসা শুধু প্রয়োজনেই এটি করা উচিত। ডাক্তাররা সত্য বলুক। আমি চাই, মা হোন সাহস নিয়ে। হাসপাতাল হোক বিশ্বাসের জায়গা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত