স্কুলে স্কুলে হঠাৎ অসুস্থ শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫৪ এএম

খাবার না খেয়ে স্কুলে আসা এবং বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী। তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে গত কয়েক দিনে মুরাদনগর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রায় ২৫ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ে একদিনেই ১৮ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারায়। পরে তাদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালীন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনা আক্তার মিতু প্রথমে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরই আরও ৬ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারায়। এরপর যারা তাদের সহযোগিতা করতে গিয়েছিল, তারাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। একে একে ১৮ জন শিক্ষার্থী খিঁচুনি দিয়ে জ্ঞান হারালে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে গুজব ছড়ায় যে, এটি একটি ‘ছোঁয়াচে কালো বাতাস’। পরে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে তাদের বাড়িতে পাঠান।

গতকাল সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নবম শ্রেণির ক্লাসে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। অসুস্থতার আতঙ্কে অনেক শিক্ষার্থীই ক্লাসে আসেনি। পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীমা সুলতানা তাবাসসুম বলে, ‘প্রথমে আমিনা আক্তার মিতুর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। আমরা প্রথমে স্বাভাবিক মনে করলেও পরে দেখি, একে একে শিক্ষার্থীরা বলছে তাদের হাত-পা টানছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা খিঁচুনি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। যারা তাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়, তারাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।’

অন্য শিক্ষার্থী তাকিয়া আক্তার বলে, ‘আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ মেয়ে ভোরে প্রাইভেট পড়তে যায়। সেখান থেকে সরাসরি স্কুলে চলে আসে। প্রাইভেট ও স্কুলের সময় মিলাতে গিয়ে সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবার খাওয়া হয় না। দুপুরে কেউ ঝালমুড়ি, কেউ শিঙাড়া-পুরি খেয়ে ক্ষুধা মেটায়। বিদ্যালয়ে পাইপলাইনের পানির ব্যবস্থা আছে, কিন্তু বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই।’

পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভোরে প্রাইভেটে যায় এবং সেখান থেকে স্কুলে আসে। ফলে তাদের ঠিকমতো খাওয়া হয় না। এই গরমে প্রয়োজনীয় পানি পানও তারা করে না। আমরা ধারণা করছি, এসব কারণেই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খাবার আনতে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে বাধ্য করার চেষ্টা করব।’

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, শুধু পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয় নয়, কামাল্লা ডি আর এস উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর ডিআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ভুবনঘর-নহল আলহাজ আব্দুল বাতেন সরকার উচ্চ বিদ্যালয়সহ উপজেলার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই অবস্থা। প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ দাবি করে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সরেজমিনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বিদ্যালয়গুলোতে বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই; শিক্ষার্থীরা পাইপলাইনের পানি পান করে। অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সকালে নাশতা না করেই স্কুলে আসে এবং ঝালমুড়ি বা শিঙাড়া-পুরি দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে।

মুরাদনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সফিউল আলম তালুকদার বলেন, ‘বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের উদাসীনতার কারণে শিক্ষার্থীরা খাবার না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রতিটি বিদ্যালয়ে চিঠি দিয়েছি, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না এবং বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, অভিভাবকদের সচেতন করতে প্রতি মাসে সমাবেশ করছি। অভিভাবকরা যদি আরেকটু সচেতন হন, তাহলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত