কুমিল্লা এখন আর শুধু পরিবহণনগরী নয়, দুর্ঘটনার শহর হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠছে। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক গুণ বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে নগরীতে। এর ফলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। ব্যাহত হচ্ছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা এবং প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনা অনেকের জীবনকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার অটোরিকশা চলাচলের উপযুক্ত। কিন্তু বাস্তবে নগরীতে প্রতিদিন চলছে প্রায় ৪৫ হাজার অটোরিকশা। এত বেশি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে না পেরে সড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
সম্প্রতি কুমিল্লা ওষধ কোম্পানির প্রতিনিধি বিল্লাল হোসেন মোটরবাইকে শাকতলা এলাকায় যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি অটোরিকশার ধাক্কায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার অভিযোগ, চালকরা নিয়ম-নীতি জানে না। এখনই যদি সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরে, সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
গণমাধ্যমকর্মী আনোয়ার হোসেনের পা ভেঙে গেছে একটি অটোরিকশার ধাক্কায়। ছয় মাস চিকিৎসার পরও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা কানাই দত্তের পায়ের আঙুল কেটে গেছে দুর্ঘটনায়। আর ফৌজদারি এলাকার রোকসানা আক্তার দীর্ঘ তিন মাস হাঁটতে পারেননি একটি অটোরিকশার ধাক্কায় আহত হয়ে। এসবই প্রতিদিনের ঘটনা। নগরীর সাধারণ মানুষের কাছে অটোরিকশা এখন আশীর্বাদের চেয়ে আতঙ্কের নাম বেশি হয়ে উঠছে।
সরাসরি নগরীর বিভিন্ন সড়কে ঘুরে দেখা গেছে, শাসনগাছা, কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ, চকবাজারসহ প্রধান সড়কগুলোতে অবাধে দাঁড়িয়ে আছে অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এতে যানজট তীব্র হচ্ছে, গাড়ি চলাচল হচ্ছে মন্থরগতিতে। যদিও দেশে অটোরিকশা আমদানি নিষিদ্ধ, তবুও টমসমব্রিজ থেকে জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত বাজারে অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে অটোরিকশা। এ কারণে সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
অধিকাংশ চালকের বয়স অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের অনেকের আবার নেশার প্রবণতা রয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০০ জন অটোরিকশা চালকের মধ্যে অন্তত ৩০ জন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালান। যা দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে ১১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক থাকলেও অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। এর প্রধান কারণগুলো হলো অবৈধ পার্কিং, অবৈধ দোকানপাট, অতিরিক্ত ইজিবাইক ও অটোরিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল, সড়কের নির্মাণ ও মেরামত কাজ এবং ট্রাফিক পুলিশের অপ্রতুল জনবল।
নগরবিদ ড. আহসান কবির বলেন, যানজট কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। বিশেষ করে বিকল্প গণপরিবহন চালু করা, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল ও আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দরকার। আরও দরকার সড়ক সম্প্রসারণ ও বিকল্প রুট তৈরি করা, নির্দিষ্ট পার্কিং জোন ও অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা। নিবন্ধনবিহীন ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করাও খুব প্রয়োজন।
কুমিল্লা জেলা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সারোয়ার মো. পারভেজ বলেন, আমাদের এখানে লোকবলের তীব্র সংকট। ৭৯ জন ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, যেখানে অন্তত ২০০ জন ট্রাফিক সদস্য প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন জানান, প্রাথমিকভাবে ৬ হাজার অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। গ্রাম থেকে আসা অটোরিকশাগুলো শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড বসানো হবে, যাতে চালকের পরিচয় শনাক্ত করা যায়।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সার বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং অবৈধ অটোরিকশার চলাচল বন্ধে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।
কুমিল্লাবাসীর অভিযোগ, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আনতে বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। নগরীর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্ঘটনা কমাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বাগাতিপাড়ায় এক রাতে দুই ভাইয়ের ভ্যান চুরি
ডাকসু নিয়ে ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলন
‘তালাক’ দিয়ে একই নারীকে বিয়ে, সমাজচ্যুত দিনমজুরকে মারধর