এলডিসি থেকে উত্তরণে শক্তিশালী প্রস্তুতি দরকার

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৩:২২ এএম

ব্যবসায়ীরা এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ যখনই হোক না কেন, এখন থেকেই তার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। যা সামাল দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

গতকাল রবিবার মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনাবিষয়ক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এ সময় ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেনসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, আমরা এলডিসি উত্তরণ পেছালেও একদিন না একদিন সেটাতে যেতেই হবে। এটি পেছানোর জন্যও নানা প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়নে অপ্রস্তুত দেখাতে হবে। এরপর সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে জাতিসংঘ। কিন্তু আমাদের অনেক ক্ষেত্রে এলডিসির শর্ত পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার। এই মাথাপিছু আয় এ যাবৎকালের রেকর্ড। মৃত্যুহার কমেছে। এমন নানা ক্ষেত্রে সফলতা দেখানো হয়েছে। ফলে প্রস্তুতি রাখতে হবে।

তিনি বলেন, প্রস্তুতি নেই কিন্তু কোনোভাবে এলডিসি হয়ে গেলে সেটা বড় আত্মঘাতী হবে। লাইসেন্স, পেটেন্ট চলে গেলে একটা ইনসুলিন কিনতে হবে আটগুণ দামে। অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। ফলে ক্রমাগত প্রস্তুতি দরকার, এলডিসি যখনই হোক।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, আমরা এলডিসি উত্তরণ করব, এটা সরকারি সিদ্ধান্ত। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রস্তুতির কাজ করা দরকার, আমরা সেটা করে যাব। এ নিয়ে অনেক কমিটি কাজ করছে। প্রতি দুই মাস পরপর প্রধান উপদেষ্টাকে কার্যক্রম নিয়ে অপডেট দেওয়া হচ্ছে। এখন কাজ না করলে সেটা যদি পাঁচ বছর পেছায়, তখনো আমরা একই প্রস্তুতির অভাবের কথা বলে যাব। এর মধ্যে রাজনৈতিক সরকার এলে, তখন তারা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআইয়ের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বর্তমান এলডিসি থেকে উত্তরণে খাতভিত্তিক উন্নয়নের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাজার সুবিধা, বাণিজ্য সহজীকরণ, রপ্তানিমুখী উৎপাদন সহায়তা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, একটি শক্তিশালী উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং নীতিগুলোকে হালনাগাদ করার জন্য এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা অন্তত তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া অপরিহার্য।

ডিসিসিআই সভাপতি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, বাংলাদেশে রপ্তানি ৩.০৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে ৪৬.৮ শতাংশ। এ অবস্থায় রপ্তানি ত্বরান্বিত করতে পণ্যের মূল্য সংযোজন, বৈচিত্র্যকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, সাপ্লাই চেইন সংযোগ বৃদ্ধি এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য কূটনীতি ত্বরান্বিত করতে হবে।

তিনি বলেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে, তবুও এ কারণে আত্মতুষ্ট না হয়ে বরং উচ্চমানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী ক্রেতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং ইএসজি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণের দিকে বেশি মনোযোগী হতে হবে।

এ ছাড়া তিনি জানান, ২০২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে, চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১.৬৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৬৭.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, ওষুধ শিল্পে রপ্তানি ১৫.৮৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮.৭৪ মিলিয়ন ডলারে, অন্যদিকে হালকা প্রকৌশল খাতের রপ্তানি একই সময়ে ১২.৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৫.৪৯ মিলিয়ন ডলারে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের অর্থনীতির অবস্থা এখন মন্দের ভালো। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কম। ব্যাংকে টাকা নেই, কিন্তু অনেকের পকেটে টাকা আটকে রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানির চেয়ে আমদানি ৪৮ শতাংশ বেশি। কারণ আমরা অত্যন্ত পশ্চিমামুখী। এর আরেক বড় কারণ ওইদিকে টাকা ও নাগরিকত্ব পাচার করা সহজ। এ দেশ থেকে সবাই টাকা-পয়সা নিয়ে ওদিকে চলে যেতে চায়। এভাবে অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বক্তারা বলেন, এলডিসির জন্য বড় প্রস্তুতি দরকার। রপ্তানি ইউরোপনির্ভর না করে সবখানে বাড়াতে হবে। কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে। রপ্তানি ওষুধে নতুন নতুন ইনোভেশন দরকার। এসএমই খাতে পণ্যের স্ট্যান্ডার্ড, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, নলেজ ও বিনিয়োগ দরকার। দেশের ইকোনমিক জোনগুলো শুধু জমি বিক্রির জায়গা না বানিয়ে সেখানে ইকোনমিক লিংকেজ বাড়াতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত