জাতীয় নির্বাচনের ভিত্তি স্থাপন

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:২৭ এএম

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় ছাত্রসমাজের ভূমিকা সবসময়ই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের মুক্তি সংগ্রাম থেকে শুরু করে, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্ররা ছিল অগ্রণী সারিতে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। যে সংসদ একসময় জাতীয় রাজনীতির ট্রেনিং গ্রাউন্ড ছিল, তা এখন শুধু স্মৃতির অংশ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত ডাকসু ছিল রাজনীতি পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। তৎকালীন ছাত্রনেতাদের দৃঢ় নেতৃত্ব শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ইতিহাস বলছে যখনই জাতি সংকটে পড়েছে, ডাকসুই তখন আশার আলো দেখিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা নব্বইয়ের গণআন্দোলন প্রতি ক্ষেত্রে ডাকসু নেতৃত্ব দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ডাকসু শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে। প্রশ্ন জাগে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কেমন হবে? রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংঘাত আর প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে সাধারণ মানুষ ক্রমেই হতাশ হচ্ছে। এ অবস্থায় ছাত্রসমাজকে নতুন করে সক্রিয় করা, গণতন্ত্রের প্রাণ ফেরানোর জন্য জরুরি। আর সে পথের সূচনা হতে পারে ডাকসু নির্বাচন দিয়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি অনেকাংশে দলীয়করণ, সহিংসতা আর দখলবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ডাকসু নির্বাচন হতে পারে একটি নতুন সূচনা, যা তরুণদের রাজনীতির প্রতি আস্থা আনবে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন ছাত্রসমাজকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারেনি। ভোটকেন্দ্র দখল, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং বিরোধী পক্ষের অভিযোগগুলো নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ডাকসু নির্বাচন হতে হবে, সত্যিকারের অবাধ ও গ্রহণযোগ্য। যদি এবারও অনিয়ম হয়, তবে তা তরুণদের রাজনীতির প্রতি আস্থা আরও ক্ষয় করবে। বিপরীতে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সেটি জাতীয় নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আজকের বাস্তবতায় ডাকসু নির্বাচন জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমছে। তরুণরা রাজনীতি বিমুখ হচ্ছে, কারণ তারা স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা বা গণতান্ত্রিক আচরণ দেখতে পাচ্ছে না। একটি সুষ্ঠু ডাকসু নির্বাচন, সেই আস্থাহীনতা কাটিয়ে তুলতে পারে। তরুণদের মধ্যে যদি গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, তবে তা জাতীয় রাজনীতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। ডাকসু কেবল ছাত্রদের প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির এক অমূল্য শিক্ষালয়। ছাত্ররা যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, তবে তারাই একদিন জাতীয় রাজনীতিতে সৎ প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে সবার মনে যে শঙ্কা, সেটি নিরসনের জন্য ডাকসু নির্বাচন হতে পারে একটি ‘ডেমো মডেল’।

প্রশ্ন হলো কীভাবে? এখানে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা যদি আন্তরিক হয়, তবে ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে জাতিকে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া সম্ভব গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে রাখা যাবে না। আর যদি আবারও অনিয়ম, পক্ষপাত ও দমননীতি প্রাধান্য পায়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, পুরো দেশে পড়বে। তাই ডাকসু নির্বাচনের সুষ্ঠু আয়োজন আসলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারেরই অংশ। ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ কেমন হবে, সেটিই আসলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি নির্বাচনকালীন সহিংসতা, দখলদারি বা প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়, তবে তা জাতীয় নির্বাচন নিয়েও সংশয় তৈরি করবে। আবার যদি ডাকসুতে সত্যিকারের প্রতিযোগিতা, সহনশীলতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি গোটা জাতির কাছে আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে। একটি গ্রহণযোগ্য ডাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের জন্য বার্তা দেবে যে, ইচ্ছা থাকলে, গণতন্ত্রের অনুশীলন সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডাকসু নির্বাচনের সফলতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে। তারা বুঝতে পারবে, তরুণদের সামনে গণতন্ত্রের ইতিবাচক চর্চা তুলে ধরা ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়। তখন এটি শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতিকে শুধু শক্তিই দেবে না, বরং দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক যাত্রাকে নতুন গতি দেবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তাই ডাকসু নির্বাচন হতে পারে একটি পরীক্ষামূলক মঞ্চ, একটি নৈতিক ভিত্তি। সুষ্ঠু ডাকসু নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলকেও বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশ গণতন্ত্র চর্চায় আন্তরিক। এতে সংসদ নির্বাচন কমিশনের ওপরও চাপ বাড়বে অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য। একই সঙ্গে তরুণদের হাতে গড়ে উঠবে নতুন নেতৃত্ব, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে। ডাকসু নির্বাচন কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং  দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে চাইলে, ডাকসুকে হতে হবে তার প্রথম পদক্ষেপ। তরুণ প্রজন্মই আগামী দিন দেশ চালাবে। তাদের হাতে যদি এখন থেকেই গণতন্ত্রের অনুশীলন ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সুযোগ তুলে দেওয়া যায়, তবে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে। সময় এসেছে, নতুন করে বলার ডাকসু নির্বাচনই হোক ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভিত্তি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত