দেশ রূপান্তর : দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাপকহারে বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সব ব্যাংকের রেমিট্যান্স আহরণই বেড়েছে। এক্ষেত্রে কি জনতা ব্যাংক বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিয়েছিল?
মজিবর রহমান : সবার মতো করেই জনতা ব্যাংকের মাধ্যমেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এরপরও আমাদের বিশেষ উদ্যোগ ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের চারটি একচেঞ্জ হাউজ রয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই শাখাগুলোতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। যেসব প্রবাসীর দেড় হাজার দিরহাম পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য কোনো চার্জ বা কমিশন নেওয়া হয়নি। এটা আমাদের রেমিট্যান্স আহরণ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নানা উদ্যোগের ফলে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ২০২৪ সালে ২০ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৬ হাজার ১২৩ কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে।
দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্স বাড়ানোর ভবিষ্যতে আরও কোনো পরিকল্পানা আছে?
মজিবর রহমান : ইতালির মিলান ও রোমে জনতা ব্যাংকের দুটি একচেঞ্জ হাউজ রয়েছে। ব্যাংক অব ইতালি আমাদের ১০০টা এজেন্ট পয়েন্ট করার অনুমোদন দিয়েছে। এই এজেন্ট পয়েন্টগুলো কার্যকর হওয়ার পর জনতা ব্যাংক পুরো ইতালি থেকেই রেমিট্যান্স আহরণ করতে পারবে। এই ধারাবাহিকতা ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে কাজ করা হবে। আগে দুটো শাখার মাধ্যমে যে রেমিট্যান্স আসত, এখন এটা বাড়বে।
একই রকম পরিকল্পনা রয়েছে মধ্যপ্রাচের জর্ডান এবং সৌদি আরবে। এ দুটো স্থানে আমরা ব্রাঞ্চ না হলেও সাব-ব্রাঞ্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে, সঙ্গে থাকবে এজেন্ট পয়েন্ট। এতে করে দেশ দুটি থেকেও প্রচুর রেমিট্যান্স আহরণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : দেশের সার্বিক রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি কি হুন্ডির ওপর চাপ তৈরি করছে?
মজিবর রহমান : রেমিট্যান্স প্রবাহ হুন্ডিকে একটা চাপে রেখেছে। তবে আমার কাছে মনে হয় টাকা পাচারকে সামনে রেখে হুন্ডিটা ব্যবহার হয়। এদেশের টাকা কিন্তু বিদেশে যায় না। বাংলাদেশের টাকাটা দেশেই থাকে, কিন্তু ডলার যেটা দেশে আসার কথা সেটা আসে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যেহেতু পাচার করার সুযোগ কমে গেছে, সব জায়গায় আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছতা এসেছে, অ্যাকাউন্টিবিলিটি বেড়েছে। যার দরুন বাইরে থেকে ডলারটা আসছে। এটা একটা কারণ।
দেশ রূপান্তর : বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?
মজিবর রহমান : আমরা বৈধপথে রেমিট্যান্স আনার জন্য বিদেশে নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউজ, ড্রইং অ্যারেঞ্জমেন্ট ও করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক নেটওয়ার্ক বাড়িয়েছি। এছাড়া ডিজিটাল চ্যানেলের (বিকাশ) মাধ্যমে দ্রুত ও নিরাপদে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা রেখেছি।
দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় আরও কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
মজিবর রহমান : অনেক সময় বলা হয় রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রণোদনা আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। এটা আসলে পুরোপুরি কাজ করে না। এগ্রিগেটর যারা আছে তারা যাতে বড় ধরনের দর কষাকষি না করতে পারে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ বন্ড, আবাসন প্রকল্প, সঞ্চয় স্কিম চালু করা যেতে পারে।
দেশ রূপান্তর : জনতা ব্যাংকের সংকটকালে আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন, কীভাবে সামলাচ্ছেন?
মজিবর রহমান : একটা সংকটাপন্ন ব্যাংকের প্রথম সমস্যা হচ্ছে মানুষের আস্থা ফেরানো। এ জন্য প্রথমেই আমি দ্রুত কিছু প্রডাক্ট ডিজাইন করি। কিন্তু এগুলো তো যারা সেল করবে তাদেরও অ্যাকটিভ করতে হবে। ব্যাংকের ১৪ হাজার কর্মীকে মাঠে নামাতে একটা পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হলো। যারা ঋণ রিকোভার করবে তারা একটা ক্যাশ ইনসেনটিভ পাবে। প্রত্যেককে ডিপোজিট আনার টার্গেট দেওয়া হলো একেবারে বেসরকারি ব্যাংকের মতো করে। তাদের বলা হলো এই টার্গেট যারা অর্জন করতে পারবে তারা পদোন্নতিতে এক নম্বর বেশি পাবে। যারা অর্ধেক করবে সেই অনুযায়ী নম্বর পাবে।
এতে করে ব্যাপক একটা পরিবর্তন এলো ব্যাংকে। গত ডিসেম্বরের জনতা ব্যাংকের ক্লোজিং ডিপোজিট ছিল ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। সেটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটি নিয়ে এত নেগেটিভ ইমেজের পর আমরা যে ডিপোজিট গ্রোথ দেখালাম সেটা এক কথায় অসাধারণ।
এটা আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটা বড় জায়গা ছিল। আমরা সেটা করতে পেরেছি। কারণ আমরা খারাপ অবস্থার মধ্যে প্রতিদিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা ধার করতে হতো, সেটা এখন ১০ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
দেশ রূপান্তর : জনতা ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সংকট, কীভাবে কাটিতে উঠছেন?
মজিবর রহমান : জনতা ব্যাংকের যা ঋণ দেওয়া হয়েছিল সেটা ৪-৫টা শাখা থেকে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু মুষ্টিমেয় মানুষকে। এখন সারা দেশে এসএমই এবং সিএমএসএমই ঋণ বিতরণে কাজ শুরু করলাম। ছোট ছোট ঋণ। এমনও করা হলো যেসব ম্যানেজার ঋণ দিতে পারছেন না বা দিচ্ছেন না তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হলো। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। এভাবে মাঠে ধীরে ধীরে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হচ্ছে। তবে ক্ষতটা অনেক বড়, পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে অনেক সময় লাগবে।
দেশ রূপান্তর : এলসি খোলার ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতার মধ্য দিয়ে গেছে জনতা ব্যাংক?
মজিবর রহমান : যোগদানের ৭ দিনের মাথায় আমার নামে উকিল নোটিস এসেছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এলসির পেমেন্ট আটকে ছিল, ডলারের ব্যাপক সংকট ছিল। সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, নানাভাবে ডলারের সংস্থান করেছি। ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ডলারের এলসি পেমেন্ট পরিশোধ করেছি। যেগুলো ডিউ ছিল সেগুলো পরিশোধ করেছি। তখন আমরা আন্তর্জাতিকভাবে খুব চাপে ছিলাম, আমাদের এলসি নেবে কি নেবে না। এখন আমরা নিয়মিত এলসি পেমেন্টগুলো করতে পারছি। এই জায়গাটায় জনতা ব্যাংকের একটা শক্তির জায়গা তৈরি হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : রিকভারির ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে জনতা ব্যাংক?
মজিবর রহমান : বড় রিকভারির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা অনেক কষ্টকর। যেখানে রাষ্ট্রসহ সব সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। তবে ছোট ঋণগুলোর ক্ষেত্রে টাস্কফোর্স করা হয়েছে, নিজেরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ঋণ রিকভারি করছি। যেখানে সুদ মওকুফ করা দরকার সেটা করছি, যেখানে রি-শিডিউল করা দরকার সে সুবিধা দিচ্ছি। যেখানে ওয়ান টাইম এক্সিটের সুযোগ আছে সেটা দিচ্ছি। এভাবে করে আদায় করছি। ২০২৪ সালে আমরা যে পরিমাণ রিকভারি করি এ বছরের ৬ মাসে তার চেয়ে বেশি রিকভারি করেছি।
দেশ রূপান্তর : নতুন কী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে জনতা ব্যাংক?
মজিবর রহমান : শুরুতে ব্যাংকে আন্দোলন, বদলির চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা এসব কাটিয়ে উঠে নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। লোকসানি শাখাগুলোকে আমরা ভালো জায়গায় স্থানান্তর করছি। ইতিমধ্যেই দুটো শাখা স্থানান্তর করায় ভালো ফলও পাচ্ছি। যেসব ম্যানেজার কাজ করছে না তাদের শাস্তির আওতায় আনছি। আবার একই সঙ্গে একটি ম্যানেজার পুল তৈরির জন্য করছি। যেখানে প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষার মাধ্যমে এই পুলে ম্যানেজাররা আসবেন। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পারফরম্যান্স সবকিছু মিলিয়েই যাচাই-বাছাই করে এই পুলে নেওয়া হবে। কারণ এদের দিয়েই আমরা আসলে ব্যাংকটাকে আরও বেশি মানুষের আস্থায় নিয়ে যেতে চাই। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ব্যাংকটাকে লাভজনক করার একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মজিবর রহমান : দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক শওকত আলী
