রেমিট্যান্স গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করে কমার্স ব্যাংক

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫, ০২:১৪ এএম

দেশ রূপান্তর : বিদেশে আপনাদের বেশকিছু এক্সচেঞ্জ হাউজ আছে। রেমিট্যান্স দেশে আনার ক্ষেত্রে সেগুলো কি ধরনের ভূমিকা পালন করছে?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো বৈধ উপায়ে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে সহায়তা করে। এই এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো বিশ্বজুড়ে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে। তারা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশ রূপান্তর : প্রবাসীরা যাতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, সে জন্য কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন।

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : প্রবাসীদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যেমনবিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সহজ ও স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন, ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স, ট্যাক্স ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুকরণ, প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য করছাড়, শুল্ক সুবিধা প্রদান, প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান, প্রবাসীদের জন্য আলাদা ব্যাংকিং ডেস্ক, পরামর্শক সেবা ও সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা। হাউজিং, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা প্রদান। সর্বোপরি প্রবাসীদের  বিনিয়োগের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি ও ঝুঁকি হ্রাস করা।

দেশ রূপান্তর : বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আপনার  ব্যাংক কি ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বৈধপথে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স প্রেরণ ও গ্রহণ সহজীকরণ এবং সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা প্রদানে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড-এর রেমিট্যান্স ইউনিট নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণ করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সামাজিক মাধ্যম, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রভৃতির মাধ্যমে আমরা  আমাদের গ্রাহক ও প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে আসছি। এ ছাড়া সরকারি ২.৫% প্রণোদনার পাশাপাশি  আমাদের ব্যাংক থেকেও  কিছু কিছু ক্ষেত্রে নগদ বোনাস দেওয়া হচ্ছে যা প্রবাসীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করছে। রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও রেমিটেন্স সেবাকে গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ইতিমধ্যে বিকাশের সঙ্গে ব্যাংকটির চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এর ফলে পৃথিবীর যেকোনো দেশ হতে বিকাশ-এর মাধ্যমে প্রেরিত রেমিট্যান্স পরিষেবা ব্যাংক/বিকাশ গ্রাহকরা গ্রহণ করতে পারবে। এই চুক্তির ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রেমিটেন্স সেবাকে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে ও বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করবে।

দেশ রূপান্তর : আপনারা রেমিটারদেরকে কি বিশেষ কোনো সুবিধা দেন?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : আমরা রেমিটেন্স গ্রাহকদের সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা ও অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। এজন্য প্রবাসীদের পরিবারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা প্রদান, আলাদা ডেস্ক/কাউন্টার চালু  করা হয়েছে এবং ২৪/৭ কাস্টমার কেয়ার সেবা প্রদান করা হচ্ছে।  এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্স ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। ক্যাম্পেইন থেকে রেমিটার ও তাদের পরিবারকে বিভিন্ন উপহারসামগ্রী ও নগদ ইনসেনটিভ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি আমরাও সময়ে সময়ে নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকি। এ ছাড়া সহজে টাকা প্রেরণ, উত্তোলন ও স্থানান্তরের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা চালু রয়েছে। রেমিটারদের টাকা প্রেরণের সুবিধার্থে নতুন নতুন এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে  এক্সচেঞ্জ হাউজের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্সে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেটি কি অব্যাহত থাকা উচিত? হলে কেন?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : হ্যাঁ, রেমিট্যান্স প্রণোদনা অব্যাহত রাখা উচিত। কারণ প্রণোদনা প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে। ফলে হুন্ডির প্রবণতা কমে যায়। এটি বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ বৃদ্ধি করে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে  এবং বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করে। এই প্রণোদনা একদিকে যেমন প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, আমদানি দায় পরিশোধ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেও সাহায্য করে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান বাড়াতে আপনার পরামর্শ কি?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান বাড়াতে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য আরও সহজ, দ্রুত ও কম খরচের ডিজিটাল চ্যানেল চালু করা প্রয়োজন। প্রণোদনা বৃদ্ধি, বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহজীকরণ, কর-রেয়াত সুবিধা বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপর জোর দিতে হবে। এ ছাড়াও প্রবাসীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুফল এবং এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদানের গুরুত্ব তুলে ধরা উচিত। সরকার প্রবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি রেমিট্যান্সের অবদান বাড়ানো সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্সের বেশিরভাগ অর্থ ভোগবিলাসে ব্যয় হয় বলে বিবিএসের এক জরিপে জানা যায়। এই অর্থ বিনিয়োগে কাজে লাগানোর জন্য কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : রেমিট্যান্সের  অর্থ বিনিয়োগের কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যেমন প্রবাসীদের জন্য উচ্চ মুনাফার বিশেষ ডিপোজিট স্কিম, প্রবাসী বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও বিনিয়োগ স্কিম প্রবর্তন; রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে শেয়ারবাজার, বন্ড মার্কেট বা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সহজ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি; রেমিট্যান্স গ্রহীতাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ছোট ব্যবসা শুরুতে সহায়তা করা; রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থে কর রেয়াত সুবিধা বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা; রেমিট্যান্সকে ভোগ নয়, সঞ্চয় ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের উপকারিতা নিয়ে গণসচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা; প্রবাসী ও তাদের পরিবারকে কৃষি, কুটির শিল্প, পরিবহন ও আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সরকারিভাবে পরিকল্পনা ও প্রণোদনা প্রদান; এবং যেহেতু রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ গ্রামীণ অর্থনীতিতে যায়, তাই গ্রামীণ পর্যায়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়াতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রেরক ও গ্রহীতাদের জন্য বিশেষ কোনো সেবাপণ্য চালু আছে?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম: হ্যাঁ, আমাদের ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রেরক ও গ্রহীতাদের জন্য আকর্ষণীয় মুনাফায় বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় সেবাপণ্য চালু আছে। যেমন বিসিবি এনআরবি সেভিংস অ্যাকাউন্ট, বিসিবি এনআরবি ডিপোজিট স্কিম, বিসিবি ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট, বিসিবি রেসিডেন্ট ও নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট ও বিসিবি নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট।

দেশ রূপান্তর : বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার কি ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে?

মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকারি প্রণোদনা বৃদ্ধি, মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) পরিধি বাড়ানো, ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর উন্নয়ন, অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো রোধে কঠোর নজরদারি এবং প্রবাসী কর্মীদের সেবার মান উন্নত করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। এ ছাড়াও, প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি কমানো, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ থেকে দক্ষতাভিত্তিক জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ই-ওয়ালেটের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বাংলাদেশি ব্যাংকের নিজস্ব শাখা বা এক্সচেঞ্জ হাউজ স্থাপন। বিদেশি মানি ট্রান্সফার কোম্পানির সঙ্গে আরও বেশি চুক্তি (ড্রয়িং অ্যারেঞ্জমেন্ট) করা। প্রবাসী কর্মীদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচারণা (সেমিনার, সামাজিক মাধ্যম, দূতাবাসের মাধ্যমে প্রচার) বাড়াতে হবে ও হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।  তাছাড়া সরকারি উদ্যোগে টাকাকে শক্তিশালী করা যেতে পারে যাতে ডলারের বিপরীতে টাকার ডি- ভ্যালুয়েশন  না হয়। অর্থাৎ ‘মুদ্রাস্ফীতি অ্যাডজাস্ট’ হয় এবং মানুষ সঞ্চয়ে উৎসাহী হয়। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুদিন আগে মার্কেট থেকে ডলার ক্রয় করে, যার ফলে টাকার মান স্থিতিশীল ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত