রেমিট্যান্স সেবা সহজ করেছে প্রাইম ব্যাংকের গ্লোবাল এক্সেস ডেবিট কার্ড

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:২৬ পিএম

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে কতটি দেশে আপনার প্রতিষ্ঠান রেমিট্যান্স সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে? কোন কোন দেশে আপনাদের উপস্থিতি সবচেয়ে শক্তিশালী?

শামস এ মুহাইমিন : প্রাইম ব্যাংক বিশ্বের প্রধান রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশগুলো থেকে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে থাকে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের উপস্থিতি সবচেয়ে শক্তিশালী। এসব দেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ এক্সচেঞ্জ হাউজ ও মানি ট্রান্সফার এজেন্টদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করে আসছি। সিঙ্গাপুরে আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান প্রাইম এক্সচেঞ্জ ২০০৬ সাল থেকে রেমিট্যান্সসেবা দিচ্ছে। ডেস্কার রোড, জু কুন এবং চোয়া চু ক্যাংয়ে যার তিনটি শাখা রয়েছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠানো হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশ আমরা বিতরণ করে থাকি, যা আমাদের এ খাতে বাজারের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দেশ রূপান্তর : আপনার ব্যাংকের কোন সেবা বা বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়?

শামস এ মুহাইমিন : প্রাইম ব্যাংক প্রবাসী বাংলাদেশিদের পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা দেওয়া। আমাদের প্রাইম অ্যাটলাস এফসি অ্যাকাউন্ট এবং প্রাইম হাসানাহ অ্যাটলাস এফসি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রাহকরা আনলিমিটেড লেনদেন, বিদেশে টাকা পাঠানোর সুবিধা এবং গ্লোবাল এক্সেস ডেবিট কার্ড পেয়ে থাকেন। এই কার্ড ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো স্থানে এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন, অনলাইন পেমেন্ট এবং দোকানে কেনাকাটা করা যায় ।

দেশে আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা প্রবাসীদের জন্য প্রাইম এনআরটিএ অ্যাকাউন্ট এবং প্রাইম হাসানাহ এনআরটিএ অ্যাকাউন্ট সেবা দিচ্ছি, যা প্রবাসীদের দেশে দৈনন্দিন ব্যাংকিং প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, প্রবাসীদের পরিবার বা নির্ভরশীলদের জন্য রয়েছে প্রাইম পরিজন অ্যাকাউন্ট এবং প্রাইম হাসানাহ পরিজন অ্যাকাউন্ট, যার মাধ্যমে সহজে আর্থিক সহায়তা ও জীবনযাপনের খরচ মেটানো যায়।

প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে আমরা বিভিন্ন ধরনের টার্ম ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট ও সঞ্চয় স্কিম অফার করি, যা প্রচলিত ও শরিয়াহভিত্তিক উভয় ব্যবস্থায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া আমরা প্রাইম এনএফসিডি অ্যাকাউন্ট, ডায়াসপোরা বন্ড, করপোরেট বন্ড এবং সুকুক-এ বিনিয়োগের সুবিধা দিয়ে থাকি। বিশেষ করে আমাদের অফশোর ব্যাংকিং সেবা প্রবাসীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যেখানে তারা প্রাইম ওবিইউ এফসি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একাধিক রকম বৈদেশিক মুদ্রায় সঞ্চয়ের সুযোগ পান, প্রাইম ওবিইউ এফসি ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্টে আকর্ষণীয় হারে বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ করতে পারেন এবং নিরাপদ ও সহজে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা উপভোগ করতে পারেন।

দেশ রূপান্তর : হুন্ডি এখনো রেমিট্যান্স স্থানান্তরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আপনার প্রতিষ্ঠান এই অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নিয়েছে?

শামস এ মুহাইমিন : প্রাইম ব্যাংক হুন্ডি প্রতিরোধে প্রতিযোগিতামূলক হার, সহজলভ্য ও আস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া দেয়। নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে তাৎক্ষণিকভাবে (২৪/৭) রেমিট্যান্স জমা, আকর্ষণীয় বৈদেশিক মুদ্রার হারসহ সরকারের ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা যুক্ত করা এবং শক্তিশালী ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকি আমরা। তবে হুন্ডি মোকাবিলায় শুধু ব্যাংক নয়, সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি ব্যবস্থা, বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং দমন এবং বৈধ আউটওয়ার্ড রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া সহজ করা। পাশের দেশ ভারতের এলআরএস-এর মতো ধাপে ধাপে একটি রেমিট্যান্স কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশেও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের দৌরাত্ম্য কমবে, রিজার্ভ সুরক্ষিত হবে এবং স্বচ্ছতাও বাড়বে।

দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্স সংগ্রহে প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? আপনার প্রতিষ্ঠানের কি নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে?

শামস এ মুহাইমিন : প্রযুক্তি রেমিট্যান্স সংগ্রহকে গতিময় ও স্মার্ট সমাধানে পরিণত করেছে। রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে প্রবাসীদের জন্য ‘রেমিটপ্রাইম’ নামে আমাদের নিজস্ব অ্যাপ রয়েছে, যা বর্তমানে সিঙ্গাপুরে চালু রয়েছে। অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহকরা ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে নিজেই নিবন্ধন করতে পারেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনে সার্বক্ষণিক টাকা পাঠানোর সুবিধা এবং রিয়েল-টাইম লেনদেন ট্র্যাকিং ও রেট অ্যালার্ট সেবা দেওয়া হয় অ্যাপের মাধ্যমেই। আমরা শিগগিরই ‘রেমিটপ্রাইম’কে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য জিসিসিভুক্ত দেশগুলোয় চালু করার পরিকল্পনা করছি। বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশের প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় বাজার রয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রেমিট্যান্সসেবার সঙ্গে সঞ্চয়পণ্য, বন্ড, মূলধন বাজারে বিনিয়োগ এবং মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স একত্র করার উদ্যোগ রয়েছে, যাতে রেমিট্যান্স শুধু অর্থ প্রেরণেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রবাসীদের জন্য বিস্তৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দুয়ার উন্মোচন করে।

দেশ রূপান্তর : সরকার ঘোষিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনার বাইরে প্রবাসীদের আকর্ষণ করতে প্রাইম ব্যাংক আর কী ধরনের সুবিধা প্রদান করে?

শামস এ মুহাইমিন : আমরা সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য নানা সুবিধা প্রদান করি। এর মধ্যে রয়েছে উৎসব মৌসুমে প্রেরক ও প্রাপকদের জন্য বিশেষ ক্যাশব্যাক ক্যাম্পেইন, এক্সচেঞ্জ হাউজ অংশীদারদের মাধ্যমে সার্ভিস চার্জ মওকুফসহ বিভিন্ন প্রমোশন, নিয়মিত প্রেরকদের জন্য লয়্যালটি প্রোগ্রাম ও পুরস্কারভিত্তিক ক্যাম্পেইন এবং প্রাপকদের জন্য ই-কেওয়াইসিভিত্তিক সহজে অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা। পাশাপাশি আমরা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির মতো দেশেও আমাদের রেমিট্যান্সসেবা সম্প্রসারণ করছি, যেখানে স্থানীয় মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের সঙ্গে অংশীদারত্ব, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং লক্ষ্যভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরি করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ওমান এবং ইউরোপের মতো অঞ্চল থেকে রেমিট্যান্স বাড়াতে আগামী বছরে আপনার প্রতিষ্ঠানের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

শামস এ মুহাইমিন : রেমিট্যান্স বাড়াতে আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক এক্সচেঞ্জ হাউজ ও এগ্রিগেটরদের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো, প্রবাসী শ্রমিক ক্লাস্টারগুলোতে সরাসরি যোগাযোগের জন্য রিলেশনশিপ ম্যানেজার ও ফিল্ড এজেন্ট নিয়োগ, শ্রমিক ক্যাম্প, ধর্মীয় কেন্দ্র ও স্থানীয় অনুষ্ঠানে কমিউনিটি-কেন্দ্রিক ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং দূতাবাস ও কল্যাণ অফিসগুলোর সঙ্গে মিলে আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আমরা বড় বড় রেমিট্যান্স করিডরে রেমিটপ্রাইম ও ডিজিটাল অনবোর্ডিং চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। একই সঙ্গে প্রবাসীদের মধ্যে বেশি পরিচিত মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের (এমটিও) সঙ্গে যৌথ ব্র্যান্ডিং চ্যানেলও তৈরি করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

শামস এ মুহাইমিন : বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে, তবে আরও অগ্রগতির জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। প্রতিযোগিতা ও সেবার পরিধি বাড়াতে নতুন মানি ট্রান্সফার অপারেটর (এমটিও) ও ডিজিটাল এগ্রিগেটরদের লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে বাণিজ্যিক রেমিট্যান্স পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া এবং নিরাপদ ও সহজে ব্যবহার করা যায় এমন রেমিট্যান্স টুলস উদ্ভাবনে ব্যাংক ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইনোভেশন গ্র্যান্ট দেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পাওয়ার জন্য স্থানীয় ব্যাংকগুলোর যৌথ মালিকানায় একটি জাতীয় রেমিট্যান্স প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা প্রেরক ও প্রাপক উভয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা করবে, প্রবাসী কমিউনিটিতে সরাসরি সেবা দেওয়ার জন্য বিদেশে নিজস্ব উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতামূলক পার্টনার ফি নিয়ে আলোচনা করা, পূর্ণাঙ্গ এএমএল/সিএফটি কমপ্লায়েন্স বজায় রাখা এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত ট্র্যাকিং সুবিধা প্রদান করা, যাতে বিদেশি মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা কমে। যেহেতু রেমিট্যান্স আয়ের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই এটিকে আমাদের রপ্তানি শিল্পের মতো সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ রাখা উচিত। রেমিট্যান্স চ্যানেলে বিনিয়োগ শুধু রিজার্ভ স্থিতিশীলই করে না, অবৈধ অর্থপ্রবাহ কমায় এবং আমাদের ‘রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের’ জীবনমান উন্নত করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত