বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলসমূহ দীর্ঘদিন ধরে মৌসুমি বন্যা, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে সুবিধাবঞ্চিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। হাওরের অধিকাংশ মানুষ এককালীন কৃষির ওপর নির্ভরশীল, ফলে তাদের আয় সবসময় অনিশ্চিতই থেকে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এই অঞ্চলে পর্যটনের প্রসার ঘটছে, যা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কিন্তু নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবারের অভাব এ সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহারে এক বাধা।
এই পরিস্থিতির উন্নয়নে এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক, দুজন ছাত্র এবং খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের একজন অভিজ্ঞ সদস্যের সমন্বয়ে টিম গঠন করে হাওরের খাদ্য ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এর ফলে বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধির উন্নয়ন ঘটেছে। প্রশিক্ষক দলের শিক্ষকরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ছাদেকা হক, ফুড টেকনোলজি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম, মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোছা. সোনিয়া পারভীন।
যেভাবে শুরু
২০২৩ সালে সিটি ব্যাংকের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে খাদ্য ব্যবসায় নিয়োজিতদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পটি শুরু হয়। বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস) প্রকল্পটির সমন্বয় করে।
এই উদ্যোগটি নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক ড. সাদিকা হক বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্ভাবনাময় হলেও স্থানীয়দের মধ্যে পর্যাপ্ত জ্ঞান, পরিবহন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ফলে পর্যটকরা স্থানীয় হোটেলগুলোতে খাবার খেয়ে প্রায়ই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরছেন। এ অবস্থা চলতে
থাকলে হাওর অঞ্চলের পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি উপলব্ধি করে আমরা স্থানীয় হোটেল মালিক ও কর্মচারীদের জন্য মানসম্মত খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি।’
উদ্দেশ্য
পর্যটকদের নানা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানার পরে
বাকৃবির এই শিক্ষকরা সম্ভাবনাময় পর্যটন ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে সচেষ্ট হন। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অধ্যাপক ড. হক বলেন, ‘এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল হাওরাঞ্চলে নিরাপদ খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি,
যা পর্যটনশিল্পকে টেকসই করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। আমাদের টিমের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে আমরা একটি কার্যকর প্রশিক্ষণ মডিউল প্রণয়ন করি।’
প্রশিক্ষণ
প্রশিক্ষণ মডিউল প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা লাভের পর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গড়ায় মাঠ পর্যায়ে। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে প্রথমে মিঠামইনের প্রায় ৩০ জন নারী-পুরুষকে, পরে নিকলীর আরও ৩০-৩৫ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। কয়েক ধাপে শতাধিক হোটেল মালিক, কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ড. মোছা. সোনিয়া পারভীন বলেন, প্রথম দিকে মানুষ একদম অনীহা প্রকাশ করেছেন এবং তাদের মনোভাব এমন ছিল যে, তারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক সবই জানেন। তারপর তাদের সঙ্গে ধীরে ধীরে কথা বলে বুঝিয়ে প্রশিক্ষণে আনা হয়েছে। সেখানে গিয়ে ট্রেনিং করার মতো ভালো জায়গা খুঁজে বের করা, পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আমরা প্রশিক্ষণটি সম্পন্ন করেছি।’
সফলতা
প্রশিক্ষণ প্রদানের পর হাওরের পর্যটন এলাকার সার্বিক উন্নতির বিষয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টের কর্মীরা এখন নিয়মিত নিজেরা তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকছেনই, ভোক্তাদেরও ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যাপারে সতর্ক করছেন। এসব হোটেল রেস্টুরেন্টে কর্মী ও ভোক্তার জন্য ওয়াশরুম, পানি, সাবান, টিস্যু ও ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন নিশ্চিত করা হয়েছে তাও পরিলক্ষিত হয়। প্রতিটি সার্ভিংয়ে প্লেটের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে টিস্যু। দ্রুত এবং শোভনীয়ভাবেই খাবার পরিবেশনের বিষয়টি এখন চোখে পড়ার মতো। এই নতুন পরিবেশ বাড়িয়েছে দর্শনার্থীদের ভিড়, এর ফলে বেড়েছে হোটেলের সংখ্যা, ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। হাওর অঞ্চলের পর্যটনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
