চবিতে সংঘাতের নেপথ্যে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা!

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তিনজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি উসকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

ঘটনার সূত্রপাত : গত শনিবার রাতে চবির দুই নম্বর গেট এলাকার শাহাবুদ্দিন ভবনে ভাড়া বাসায় থাকা দর্শন বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী সাকিফা খাতুনের সঙ্গে দারোয়ানের বাকবিতণ্ডা হয়। রাত গভীর হওয়ায় দারোয়ান তাকে বাসায় প্রবেশে বাধা দিলে তিনি দারোয়ানকে চড় মারেন বলে অভিযোগ। এরপর দারোয়ান তাকে মারধর করেন। খবর পেয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী দারোয়ানকে ধরতে গেলে তিনি পালিয়ে যান। এ ঘটনায় স্থানীয়রা জড়ো হন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইলাফ জুবায়ের তালহাকে বাসার গেটে আটকে মারধর করা হয়। এই ফুটেজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে দুই নম্বর গেট এলাকায় জড়ো হন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) কয়েকজন নেতা শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে স্থানীয়দের ওপর হামলা চালানোর জন্য উৎসাহিত করেন। শিক্ষার্থীরা দোকান ও বাড়ির জানালা ভাঙচুর করলে স্থানীয়রা রামদা, ছুরিসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে গতকাল সোমবার সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে ফের সংঘর্ষ শুরু হয়। 

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ : অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাথী উদয় কুসুম বড়–য়া স্থানীয়দের উসকে দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হামলায় প্ররোচনা দেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে তিনি শিক্ষার্থীদের ‘কুলাঙ্গার’ আখ্যা দিয়ে দুই নম্বর গেট অবরোধের হুমকি দেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে তিনি এ ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু সদস্য স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফেসবুক ফুটেজে দেখা গেছে, ধানক্ষেতে এক শিক্ষার্থীকে রামদা দিয়ে কোপানো হচ্ছে। এতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার নেতা ফয়সাল মাহমুদ ত্রিশাদ জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। 

আহতদের অবস্থা : সংঘর্ষে আহত শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম রাফি ন্যাশনাল হাসপাতালের আইসিইউতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমতিয়াজ আহমেদ সায়েম পার্কভিউ হাসপাতালে এবং সমাজতত্ত্ব বিভাগের মো. মামুন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মামুনের মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা : বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চেয়েও সময়মতো সাড়া পায়নি বলে অভিযোগ। সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা তদারকি করছেন। প্রশাসন দুটি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সহকারী প্রক্টর ড. কোরবান আলী।

প্রশাসনের পদক্ষেপ : গতকাল সন্ধ্যায় জরুরি সভায় চবি প্রশাসন কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় প্রশাসন বহন করবে। ক্যাম্পাসে মডেল থানা ও রেলক্রসিং এলাকায় পুলিশ বক্স স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করা হবে। সংঘর্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। ঘটনা পর্যালোচনার জন্য আজ মঙ্গলবার সিন্ডিকেট সভা হবে ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় হটলাইন স্থাপন করা হবে।

ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি : ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। জোবরা গ্রামে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে, তবে হামলায় জড়িত কাউকে এখনো আটক করা যায়নি। আবাসিক হলের প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়েছে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রভাব : চবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। কিছু শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, বাগছাসের কয়েকজন নেতা সমঝোতার পরিবর্তে উসকানি দিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। তবে সংগঠনটি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা : শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও হামলার প্রতিবাদে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) পশুপালন ও ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থীদের সমন্বিত ডিগ্রির দাবিতে আন্দোলন চলছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা এবং হল ত্যাগের নির্দেশের প্রতিবাদে গতকাল  সকালে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও রেলপথ অবরোধ করেন। গত রবিবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সমন্বিত ডিগ্রির দাবিতে উপাচার্যসহ প্রায় ২০০ শিক্ষককে আট ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে বহিরাগতরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে সাংবাদিক ও নারী শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার পর রাত সাড়ে ৯টায় জরুরি সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীদের গতকাল সকাল ৯টার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে গেলেও একাংশ আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। গতকাল সকালে শিক্ষার্থীরা হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে ক্যাম্পাসের কেআর মার্কেটে সমবেত হন। তারা ‘রাজপথ ছাড়ব না’, ‘প্রশাসনের গদিতে আগুন জ্বালো’, ‘ক্যাম্পাসে হামলা কেন, জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

বেলা সাড়ে ১১টায় আমতলায় সংবাদ সম্মেলনে তারা ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন : ১. হল ত্যাগের নির্দেশ দুপুর ২টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে। ২. হলের সব সুবিধা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। ৩. শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা এবং হামলার দায়ে প্রক্টরিয়াল বডির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ। ৪. হামলা ও নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তার জন্য উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। ৫. হামলার সঙ্গে জড়িত শিক্ষক ও বহিরাগতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ৬. একক সমন্বিত ডিগ্রি অবিলম্বে দিতে হবে। 

এদিকে বিকেল ৪টায় শিক্ষার্থীরা জব্বার মোড়ে রেলপথ অবরোধ করেন। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ওসি মো. আক্তার হোসেন জানান, জামালপুর কমিউটার ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকে আছে। শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে এবং শিক্ষকদের মদদে বহিরাগতরা মারধর করেছে। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়, অবরুদ্ধ শিক্ষকদের উদ্ধারে আগত স্বজনদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা এ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ মনে করে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপাচার্য এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের হাতে দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত