পঞ্চম দিনেও তীব্র প্রতিরোধের মুখে উচ্ছেদ অভিযান

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৯ এএম

কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের লক্ষ্যে পরিচালিত অভিযানের পঞ্চম দিন গতকাল শুক্রবার সকালে নুনিয়ারছড়া ও নতুন বাহারছড়া এলাকায় কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও প্রশাসনের। এ লক্ষ্যে বুলডোজারসহ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা এগিয়ে গেলেও বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি। সকালে শহরের প্রধান সড়ক ও বিমানবন্দর সড়কে শত শত স্থানীয় বাসিন্দা বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা চার রাস্তার মোড়ে ব্যারিকেড দেন, টায়ার জ্বালান এবং বিমানবন্দর সড়কে ঠেলাগাড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সেনাসদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের সরাতে ব্যর্থ হন।

বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, এই উচ্ছেদ অভিযান অবৈধ। তারা খতিয়ানভুক্ত জমিতে খাজনা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন এবং প্রাণ দিয়ে হলেও উচ্ছেদ হতে দেবেন না। এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিআইডব্লিউটিএর উচ্ছেদ অভিযানের কর্মীরা যানবাহনসহ আটকা পড়েন। ফলে প্রধান সড়ক ও বিমানবন্দর সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত রাখার এবং কাগজপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানান। এমন পরিস্থিতিতে বিআইডব্লিউটিএ কর্র্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে। বুলডোজার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ফিরে গেলে রাজনৈতিক নেতারা বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেন। দুপুর ১২টার পর প্রধান সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে কক্সবাজারবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এটি সরকারকে বিব্রত করার জন্য করা হচ্ছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। এখানকার অনেক জায়গা পুরনো বসতি, যেখানে খতিয়ান ও খাজনার কাগজপত্র রয়েছে। এসব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি। জনতা অবরোধ তুলে ঘরে ফিরেছে। এখন শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কে রাখার কোনো অর্থ নেই।’

বিআইডব্লিউটিএর কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এ উচ্ছেদ অভিযান প্রথম দুদিন স্বাভাবিকভাবে চললেও তৃতীয় দিনে জনতার প্রতিরোধে বন্ধ হয়। চতুর্থ দিনে অভিযান চালানো হলেও পঞ্চম দিনে তা আবার বন্ধ রাখা হয়। এর মধ্যে দ্বিতীয় দিনে পুলিশের ওপর হামলা এবং তৃতীয় দিনে প্রতিবন্ধকতার ঘটনায় পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে দুটি মামলা করা হয়, যেখানে ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হওয়া ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁকখালী নদী রামু ও কক্সবাজার সদর হয়ে কস্তুরাঘাট-নুনিয়ারছড়া দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নুনিয়ারছড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এলাকায় সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে। গত ১০-১২ বছরে এই এলাকায় এক হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ভূমি অফিস ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে দখলদারদের তালিকা তৈরি করেছে, যেখানে প্রায় ৩৫০ প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম এসেছে। ২০১০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার বিআইডব্লিউটিএকে বাঁকখালী নদীবন্দরের সংরক্ষক নিযুক্ত করে এবং ৭২১ একর জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। কিন্তু জেলা প্রশাসন তা হস্তান্তর না করায় নদীবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ফলে দখল অব্যাহত ছিল। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ যৌথ অভিযানে ৬০০টির বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ৩০০ একরের বেশি প্যারাবনের জমি দখলমুক্ত করা হয়। কিন্তু পরে সেগুলো আবার দখল হয়ে যায় এবং দুই শতাধিক নতুন স্থাপনা গড়ে ওঠে।

গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, আগামী চার মাসের মধ্যে বাঁকখালী নদীর সীমানায় থাকা সব দখলদারের তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার কক্সবাজার সফরে আসেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি হিলটপ সার্কিট হাউজে ‘বাঁকখালী নদীদূষণ ও দখলমুক্তকরণ’ বিষয়ে সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন। সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দখলদারদের তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদ করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত