চোখে স্বপ্ন কিন্তু মাঠে বেশিরভাগ সময়ই দুঃস্বপ্ন

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৪:৩৮ এএম

নাটক বা সিনেমায়, নায়ক-নায়িকা-ভিলেনের পাশাপাশি কয়েকজন চরিত্র অভিনেতারও দরকার পড়ে। না হলে গল্প এগোয় না। দৃশ্যগুলোয় বৈচিত্র্য আসে না। এশিয়া কাপে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তানের উপস্থিতি অনেকটা অতিথি চরিত্রের মতোই। ভারত ও পাকিস্তানের ‘প্রেমকাহিনি’র ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টিস্ট। আয়োজক থেকে সম্প্রচারক, দর্শক থেকে বিজ্ঞাপনদাতা; সবাই চায় এই দলগুলো ভালো খেলুক কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেন ফাইনালে উঠতে না পারে। অপারেশন সিঁদুর আর অপারেশন বুনিয়ান উন মারসুসের সময়ে, যখন ভারতের সাবেক ক্রিকেটাররাও পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটারদের বিপক্ষে খেলতে চাইছেন না লেজেন্ডস লিগে, এ রকম সময়ে ভারত-পাকিস্তান এশিয়া কাপের ফাইনালে, কল্পনা করা যায় এর বাজারমূল্য কতটা হবে! সেই অমিত সম্ভাবনায় পানি ঢেলে দিতে পারে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা আফগানিস্তান।

এশিয়া কাপের ‘বি’ গ্রুপের চার দল হচ্ছে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও হংকং। এর ভেতর বাংলাদেশের আছে গ্রুপের বাকি তিন দলের কাছেই হারের অভিজ্ঞতা! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কিছুদিন আগে যদিও টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ, ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও জিতেছে। তবে ২০২২-এর এশিয়া কাপে, অর্থাৎ এবারের আগে যে আসরটা টি-২০ সংস্করণে হয়েছিল, সেবার শ্রীলঙ্কাকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার মাটিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথমটিতেও ডাম্বুলায় বাংলাদেশ হেরেছিল সাত উইকেটে। 

লঙ্কানরা বাঘা ওল হলে আফগানরা বুনো তেঁতুল। তাদের স্কোয়াডে ছয়জন স্পিনার। রশিদ খান, মোহাম্মদ নবি তো আছেনই, সঙ্গে আল্লাহ মোহাম্মদ গজনফর, নুর আহমেদ ও মুজিব উর রহমান আর সরাফউদ্দিন আশরাফ। স্পিনারদের সঙ্গে ফজল হক ফারুকি, নাভিন-উল-হক ও আজমতউল্লাহ ওমরজাই; পেস, ওয়ান-চেঞ্জ এবং স্পিন সব ধরনের বিকল্পই আছে রশিদ খানের হাতে। আর আবুধাবি ও দুবাইয়ের কন্ডিশন তো হাতের তালুর মতোই চেনা। ব্যাটিংটা নিয়ে অবশ্য খানিকটা ভয়; বিশেষ করে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৪২ রান তাড়া করতে গিয়ে ৬৬ রানে অলআউট হয়েছে আফগানরা। যদিও রেহমানউল্লাহ গুরবাজ, ইব্রাহিম জাদরানরা এতটা খারাপও নন। তবে তাদের ব্যাটিং বেশিরভাগ সময়েই ‘ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক’, তাই ব্রেক ফেল হলে অঘটন অনিবার্য।

হংকং একটা সময় সুপার সিক্সেস ক্রিকেট আয়োজনের জন্য ছিল বিখ্যাত, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার সময় হংকং একটা সময় বাংলাদেশের মতোই উদীয়মান ছিল। তবে চীনা শাসনে ফেরত যাওয়ার পর ক্রিকেটে হংকং আর এগোয়নি সাংস্কৃতিক কারণেই। দলগুলোয় অভিবাসী ক্রিকেটারই বেশি, নাম আর চেহারা দেখেই বলে দেওয়া যায় তারা ভারত আর পাকিস্তান থেকে অভিবাসী হয়ে এসে খেলছেন হংকং এর হয়ে। একজন আছেন দক্ষিণ আফ্রিকারও! এ রকমই কুড়িয়ে এনে জুড়ে নেওয়া ক্রিকেটারদের দল নিয়েই হংকং ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে হারিয়ে দিয়েছিল চট্টগ্রামে। এবার হংকং বেশ আগেই প্রস্তুতি নিতে চলে এসেছে আরব আমিরাতে। শ্রীলঙ্কার কোচ কৌশল মেন্ডিসের অধীনে তারা অনুশীলন করছে। কোচ জানিয়েছেন, দেশে মাঠ ও সুযোগ-সুবিধার অভাব আর বৃষ্টি, তাই আগেভাগেই চলে এসেছেন। দলের খেলোয়াড়দের অনেকেরই জন্মস্থানে প্রাদেশিক বা রাজ্যপর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা আছে, তাই দল হিসেবে খাটো করে দেখার উপায় নেই।

বাকি থাকল বাংলাদেশ। চোখে স্বপ্ন, তবে মাঠে বেশিরভাগ সময়ই দুঃস্বপ্ন। কাগজে-কলমে এশিয়া কাপকে ঘিরে সবচেয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশই। ফিটনেস ক্যাম্প, পাওয়ার হিটিং কোচের অধীনে বিশেষ ট্রেনিং ক্যাম্প, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সিরিজ। তবে বাস্তবে সবচেয়ে কম প্রস্তুতিই হয়েছে বাংলাদেশের। নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেটারদের পিকনিকের মেজাজে ডেকে এনে তাদের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচ খেলেছে লিটন দাসের দল। প্রথম দুই ম্যাচে অল্প রান তাড়া করে তিন ভাগের একভাগ সময় ব্যাটিং করা হয়নি, আর শেষ ম্যাচে বৃষ্টিতে ১৮ ওভারের বেশি ব্যাট করতে পারেনি বাংলাদেশ। দুর্বল বোলিংয়ের বিপক্ষে ব্যাটিং প্রস্তুতি হয়নি ঠিকঠাক, জুলিয়ান উডের পাওয়ার হিটিংয়ের পাঠ কতটা কাজে লাগল, সেটিও হলো না দেখা।

সাইফ হাসান ও নুরুল হাসান সোহানকে এশিয়া কাপ দলে নেওয়া হলেও তাদের খুব একটা পরীক্ষা হলো না নেদারল্যান্ডস সিরিজে। মিডল অর্ডার আর লোয়ার অর্ডারও থেকে গেছে অপরীক্ষিত। তানজিদ তামিম আর পারভেজ ইমন একসঙ্গে জ্বলে উঠছেন কমই। অধিনায়ক লিটন বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রান পাননি ঘরের মাঠে, ডাচদের বিপক্ষেও বড় রান করেছেন একাধিক জীবন পেয়ে। জাকের আলি অনিক যদিও বলেছেন এশিয়া কাপ জিততেই তারা গিয়েছেন, তবে সেই জয়ের পর্যাপ্ত বারুদের অভাবটা স্পষ্ট।

কখনো পাশর্^ চরিত্রের অভিনেতারাও অভিনয়গুণ দিয়ে নায়ক-নায়িকাকে ছাপিয়ে যান। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান বা শ্রীলঙ্কা যদি শেষ পর্যন্ত ফাইনালে খেলে, তাহলে হয়তো এ ধরনের কিছুই হবে। তবে সত্যি হচ্ছে, আয়োজক এসিসিও চায় না এই তিন দল ফাইনালে খেলুক। কারণ তাতে যে লাভ হবে না!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত