ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আম্মার

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০১:৪৭ এএম

ভোলার লালমোহন উপজেলার গজারিয়া এলাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মোহাম্মদ আম্মার। তিনি গজারিয়া ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে নিজেকে আত্মনির্ভর ও দক্ষ করে তুলেছেন। নাগাল পেয়েছেন সফলতার।

আম্মার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন প্রযুক্তির জগতে নিজের পরিচয় গড়ার। তবে প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে বড় হওয়ায় সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সহজ ছিল না। অনেক দিন ধরে তিনি নিজের লক্ষ্য নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সাহসিকতার সঙ্গে তিনি কুমিল্লায় প্রযুক্তি জগতের যাত্রা শুরু করেন। সেখানে ভর্তি হন আইটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘এক্সপার্ট আইটি পার্ক’-এর ডিজিটাল মার্কেটিং কোর্সে।

এক্সপার্ট আইটি পার্কে তিনি মেন্টর হিসেবে পান সফল ফ্রিল্যান্সার মো. ওমর ফারুককে। আম্মার বলেন, ‘ওমর ফারুক সবসময় পাশে ছিলেন। যে কোনো সমস্যায় তিনি আমাকে ধৈর্য ধরে বোঝাতেন এবং সমস্যা সমাধানের উপায় দেখাতেন।’ ফারুক বলেন, ‘আম্মারের মধ্যে সবসময়ই অদম্য আগ্রহ লক্ষ করেছি। প্রথম থেকেই সে দ্রুত শেখে এবং নতুন জিনিস চেষ্টা করতে ভয় পায় না। আমি শুধু দিকনির্দেশনা দিই, বাকি কাজ সে নিজে করে শিখে নেয়।’

ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তাহলে গ্রামের ছেলে হলেও সে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আম্মারের মধ্যে সেই সম্ভাবনা দেখেছি, আর সে তার প্রতিভা দিয়ে এটি প্রমাণও করেছে।’

প্রশিক্ষণ চলাকালে আম্মার আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসে কাজ শুরু করেন। মাত্র দুই মাসের মধ্যে ৬০ ডলার আয় করতে সক্ষম হন। বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতি মাসে শতাধিক ডলার আয় করছেন তিনি।

প্রথম দিকে নানা টেকনিক্যাল জটিলতায় পড়লেও থেমে থাকেননি আম্মার। তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে সমস্যা হওয়ার কারণে হতাশ হয়ে পড়তাম। তবে প্রতিদিন পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আমার মেন্টর মো. ওমর ফারুক। তার জন্যই আজ আমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পেরেছি।’

আম্মারের এই অর্জন কেবল অর্থিক নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘ভোলা জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ফ্রিল্যান্সিং এখনো অচেনা বিষয়। কিন্তু নিজের প্রচেষ্টায় আমি এটি শিখেছি। আমার লক্ষ্য এখানেই শেষ নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করতে চাই এবং ভবিষ্যতে নিজের আইটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করব। এতে আমার এলাকার ও দেশের নতুন প্রজন্মও ফ্রিল্যান্সিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারবে।’

গ্রামের সচেতন মহল মনে করছেন, আম্মারের সাফল্য প্রমাণ করেছে, গ্রাম বা শহর নয়, সুযোগ কাজে লাগালে যে কেউ বিশ্ববাজারে নিজের জায়গা করে নিতে পারে। লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহ আজিজ বলেন, ‘বর্তমানে এখানে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ বা সহযোগিতার কোনো সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতে কোনো সুযোগ এলে তা আগ্রহীদের জানানো হবে।’

তরুণ এই ফ্রিল্যান্সারের পরিশ্রম, ধৈর্য ও পরিকল্পনা দেখিয়ে দিয়েছে, স্বপ্ন শুধু দেখলেই হবে না, বরং সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস চেষ্টা করতে হবে। প্রতিভা ও পরিশ্রমের এই মিশ্রণে মোহাম্মদ আম্মার হয়ে উঠেছেন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তিনি দেখিয়েছেন, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা সম্ভব। তার এই উদাহরণ প্রমাণ করে, সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম থাকলে যে কেউ প্রযুক্তির জগতে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত