সহিংসতার সংস্কৃতি— শক্তি নয়, দুর্বলতার মুখোশ

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০২:২৯ এএম

আমাদের সমাজে রাগকে অনেক সময় শক্তির প্রকাশ বলে মনে করা হয়। কেউ চিৎকার করে নিজের মত চাপিয়ে দিলেই মনে হয় সে-ই বড় ক্ষমতাবান। রাস্তাঘাটে সামান্য ধাক্কা লাগলেই ঝগড়া, বাড়িতে সন্তান বা স্ত্রীকে “শাসন” করার নামে প্রহার, রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দমন করতে মারপিট—সবই যেন স্বাভাবিক এক ধারায় মিশে গেছে। অথচ এগুলো শক্তির নয়, বরং গভীর দুর্বলতার লক্ষণ।

শিশু বয়স থেকেই আমরা অজান্তে শিখি—মারধর করলে কথা মানানো যায়, রাগ দেখালে দাপট বোঝানো যায়। বাবা-মা সন্তানকে শাসন করতে গিয়ে চড়-থাপ্পড়কে স্বাভাবিক করে তোলেন। স্কুলে সহপাঠীর সঙ্গে ঝগড়া মানে “নিজের জোর প্রমাণ করা”। মিডিয়ার সিনেমা-নাটকেও নায়ক যেন রাগ আর মুষ্টিবদ্ধ হাতে সব সমস্যা মেটায়। ফলে বড় হতে হতে আমাদের ভেতরে বসে যায় এক অদ্ভুত শিক্ষা: সংলাপ বা সহনশীলতা নয়, শক্তি দেখানোই নাকি সমাধানের পথ।

কিন্তু এই পথ আসলে ধ্বংসের। ঘরের ভেতর হিংস্র আচরণে ভাঙে সম্পর্ক, তৈরি হয় ভয় আর মানসিক ক্ষত। রাস্তায় সামান্য তর্কে রক্ত ঝরার ঘটনা বাড়ায় অপরাধ। রাজনীতিতে সহিংসতা কেবল সমাজের স্থিতি নষ্ট করে, মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করে। আমরা ভুলে যাই—রাগ সাময়িক শক্তি দেখাতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না।

বিকল্প আছে, আর সেটাই শক্তির সত্যিকারের রূপ। সংলাপ, ধৈর্য, সহনশীলতা—এই গুণগুলো দুর্বলতা নয়, বরং গভীর আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। মতভেদ থাকলেও আলোচনা করে মীমাংসা করা, ভিন্ন মতের প্রতি সম্মান দেখানো, নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা—এগুলোই প্রকৃত শক্তির প্রকাশ। পরিবার থেকে শুরু করে রাজনীতি পর্যন্ত, সহিংসতার বদলে শান্তিপূর্ণ সমাধানই সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে।

সমস্যা হলো আমরা এখনো সেই প্রাচীন ধারণা আঁকড়ে আছি—রাগ মানে ক্ষমতা। এই মানসিকতা বদলাতে হবে পরিবার থেকেই। শিশুদের শেখাতে হবে, মারধর নয়, কথাই সমস্যার সমাধান। মিডিয়াকেও চাই ইতিবাচক উদাহরণ। রাজনীতিতে সহনশীলতাকে শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।

সহিংসতার সংস্কৃতি যতদিন শক্তি হিসেবে গর্বের সঙ্গে বহন করব, ততদিন সমাজে শান্তি আসবে না। সত্যিকারের শক্তি হলো নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সংলাপের পথ বেছে নেওয়া। এভাবেই আমরা ভয় নয়, মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে পারব একটি নিরাপদ ও সভ্য সমাজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত