তাপমাত্রায় দেশে বছরে ক্ষতি ২২ হাজার কোটি

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:০৫ এএম

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে এটি উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংকের ‘ভঙ্গুর জীবন : বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর তাপমাত্রার প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। এর ফলে দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে শুধু ২০২৪ সালেই ২৫০ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা) অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশের সমান।

প্রতিবেদন প্রণয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছে। এ ছাড়া, ২০২৪ সালে দুই ধাপে ১ হাজার ৬০০টি খানার ওপর জরিপ পরিচালনার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রকৃত তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে অনুভূত তাপমাত্রা (ফিল লাইক) সর্বোচ্চ ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এ তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ডায়রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ এবং বিষণœতার মতো সমস্যা বাড়ছে। উচ্চ তাপমাত্রা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণœতার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব অত্যন্ত তীব্র। এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গবেষণা প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এগুলোকে সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করতে হবে। প্রতিটি সংস্থার দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং জাতীয় অংশীদারদের সমন্বিতভাবে কাজ করে এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জাঁ পেসমে এবং দক্ষিণ এশিয়া স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা বিভাগের প্র্যাকটিস ম্যানেজার ড. ফেং ঝাও উপস্থিত ছিলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ইফফাত মাহমুদ এবং সিনিয়র হেলথ স্পেশালিস্ট ওয়ামেক এ রাজা। জাঁ পেসমে বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু মৌসুমি অস্বাভাবিকতা নয়, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর ক্ষতি করছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে এবং দেশের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। জলবায়ু অভিযোজন ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।’

জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি : এদিকে, গতকাল লন্ডনে গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্স (জিসিএইচএ) ‘ক্রেডল টু গ্রেভ : দ্য হেলথ টোল অব ফসিল ফুয়েলস অ্যান্ড দ্য ইম্পেরেটিভ ফর আ জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি জনস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক ক্ষতি করছে। জিসিএইচএর ক্যাম্পেইন লিড শ্বেতা নারায়ণ বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি সরাসরি স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানছে। এটি নারীদের গর্ভপাত, শিশুদের লিউকেমিয়া, হাঁপানি, ক্যানসার, স্ট্রোক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হচ্ছে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এমনকি কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও জীবাশ্ম জ্বালানি আমাদের বাতাস, পানি ও শরীরকে বিষাক্ত করতে থাকবে। এটি শুধু জলবায়ুর জন্য নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি সংকট।’

প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য প্রতি বছর প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দেওয়া হয়, যার মধ্যে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক ক্ষতির গোপন খরচও অন্তর্ভুক্ত।

জীবাশ্ম জ্বালানির সুবিধাভোগী প্রধানত ধনী শ্রেণি হলেও, এর ক্ষতির শিকার হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এটি ধনী-দরিদ্রের মধ্যে স্বাস্থ্য বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এ সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত