অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। এতে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ভে-াবাড়ি এলাকায় তিস্তা নদীর ডানতীরের প্রধান বাঁধ ও এক নম্বর স্পার বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। ভাঙনরোধে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভারতের পূর্ব-উত্তর প্রদেশ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিহার পর্যন্ত একটি ঘূর্ণাবর্তের কারণে উত্তরবঙ্গের আকাশে বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্পের আগমন ঘটেছে। এরই ফলস্বরূপ গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশের পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ ভারতের বিভিন্ন জেলায় অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাতভর বৃষ্টির মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশের পঞ্চগড় এবং ভারতের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও কোচবিহার। সকাল থেকেও আকাশ মেঘে ঢাকা। সকাল ৯টার পর বৃষ্টিতে ভিজছে বিভিন্ন এলাকা।
এদিকে অতিভারী বৃষ্টির জেরে উজানের ঢলে তিস্তা নদীর প্রবল স্রোত ও দিক পরিবর্তনে ডিমলার ঝুনাগাছচাঁপানী ইউনিয়নের ভে-াবাড়ী নামক স্থানে ডানতীরের প্রধান বাঁধ ও ১৪০ ফুট দীর্ঘ একটি স্পার বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেখানে ভাঙনরোধে নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জরুরিভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলছে। সচেতন মহল বলছে, অতিভারী বৃষ্টির দুর্যোগ পুরো এলাকাকে ঝুঁকির মাত্রা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় মুঠোফোনে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তেঁতুলিয়ায় ২০২ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে নীলফামারী সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ লোকমান হাকিম জানান, গতকাল সকাল ৯টার পর থেকে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অতিভারী বৃষ্টি শুরু হয়। তবে সকাল ৯টার পূর্ব পর্যন্ত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২০২ মিলিমিটার, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ২৭ মিলিমিটার, দিনাজপুরে ৩ মিলিমিটার, রংপুরে ২ মিলিমিটার, নীলফামারীর ডালিয়ায় ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে সকাল সাড়ে ১১টার পর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেকটা কমেছে বলে তিনি যোগ করেন।
স্থানীয়রা জানান, অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের তীব্র স্রোতে তিস্তা নদীর দিক পরিবর্তন করে ভয়াবহ ভাঙনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছচাঁপানী ইউনিয়নে ভে-াবাড়ি নামক স্থানে এক নম্বর স্পার বাঁধে ধস নেমেছে। সেখানকার ডানতীরের প্রধান বাঁধটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেখানে ভোর ৫টা থেকে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, এলাকার শ্রমিক ও জরুরিভিত্তিতে ঠিকাদার জিও ব্যাগ, জিও টিউব, বাঁশ ও গাছের গুঁড়ির পাইলিং করে ভাঙনরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তারা আরও জানান, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে নীলফামারীর ডালিয়ার তিস্তা ব্যারেজের ভাটি এলাকা হুমকির মুখে পড়েছে। নদী ধীরে ধীরে ডানতীরের দিকে সরে আসছে। ডানতীরের প্রধান বাঁধটি বিধ্বস্ত হলে তিস্তা নদী মূল প্রবাহের গতিপথ ছেড়ে ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছচাঁপানী, জলঢাকা উপজেলার গোলমু-া, ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়ন ও জলঢাকা শহর ছুঁয়ে প্রবাহিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর সিকিমে ভয়াবহ বৃষ্টির জেরে বড় বন্যা হয়েছিল তিস্তায়। ওই সময় পলি পড়ে তিস্তায় নাব্য কমে যায়। একইসঙ্গে নদী তার দিক পরিবর্তন করে কখনো বাম তীর, কখনো ডান তীরের দিকে সরে যাচ্ছে।
এলাকার কৃষকরা জানান, পানির তলে শুধু বাড়িঘর নয়, এলাকার কৃষিজমি, ফসল ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাসের পর মাস পরিবার নিয়ে বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। গতকালও অনেক পরিবার বসতঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘সেখানে ১৪০ ফুট দীর্ঘ এক নম্বর স্পার বাঁধ ও ডানতীর প্রধান বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। হঠাৎ করে এখানে তিস্তা নদী দিক পরিবর্তন করে ডান তীরের দিকে সরে এসেছে। নদীর তীব্র স্রোত আঘাত করছে এখানে। বৃষ্টির মধ্যেই অসংখ্য শ্রমিক নিযুক্ত করে ভাঙন মোকাবিলা করা হচ্ছে।’
