জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির আরও দুই নেতা। ওই অধিবেশনে যোগ দিতে গতকাল রবিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা।
সফরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে থাকবেন ছয় রাজনৈতিক নেতা। তারা হলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং শেষ মুহূর্তে সফরসঙ্গী হয়েছেন জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. নকিবুর রহমান তারেক ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা।
জামায়াত ও এনসিপি সূত্র জানায়, প্রতিনিধিদলে বিএনপির দুই নেতা থাকায় তাদের দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিতে সরকারকে অনুরোধ করা হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন কঠিন হওয়ায়, আগে থেকে যাদের মার্কিন ভিসা রয়েছে, তাদের বেছে নেওয়া হয় প্রতিনিধিদলে।
জামায়াতের দলীয় সূত্রমতে, সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. নকিবুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি প্রধান উপদেষ্টার প্রতিনিধিদলে যোগ দেবেন।
অতীতে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে সরকারপ্রধানের প্রতিনিধিদলে মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ছিলেন। এই প্রথম ক্ষমতায় নেই এমন রাজনৈতিক দলের নেতারা যাচ্ছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বড় প্রতিনিধিদল নিয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। গত বছর ড. ইউনূস আটজনের প্রতিনিধিদল নিয়ে জাতিসংঘে যান। এবার তিনি রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে যাচ্ছেন।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানিয়েছে, অধ্যাপক ইউনূস আজ সোমবার নিউ ইয়র্কে পৌঁছাবেন এবং ২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। উপদেষ্টা একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বৈশ্বিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। সফর শেষে আগামী ২ অক্টোবর দেশে ফিরবেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক উদ্যোগ, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের দৃঢ় অঙ্গীকার বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন।
এবার উচ্চপর্যায়ের সভার মধ্য দিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮০তম বার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠান শুরু হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ বছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির সভাপতিত্বে ‘হাই লেভেল কনফারেন্স অন দ্য সিচুয়েশন অব রোহিঙ্গা মুসলিমস অ্যান্ড আদার মাইনোরিটিস ইন মিয়ানমার’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের সভা হবে। রোহিঙ্গা সংকট কেন্দ্র করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এমন একটি উচ্চপর্যায়ের সভার আয়োজন এবারই প্রথম।
উচ্চপর্যায়ের সভা থেকে যেন রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানের একটি কার্যকর পরিকল্পনা উঠে আসে, সেজন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে গত মাসে কক্সবাজারে একটি অংশীদার সভা হয়।
অধ্যাপক ইউনূস গত বছর জাতিসংঘে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে এবার এ সম্মেলন হতে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্মেলন আয়োজনের জন্য প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া প্রস্তাব সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন দেয়।
প্রধান উপদেষ্টা ২৫ সেপ্টেম্বর যুবকদের জন্য কর্মপরিকল্পনার ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন। বাংলাদেশ শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং শান্তিরক্ষী রাষ্ট্র হিসেবে দেশের অবদান তুলে ধরবে।
অধ্যাপক ইউনূস তার ভাষণে বিশ্বের নানা জরুরি ইস্যুও তুলে ধরবেন। এর মধ্যে রয়েছে শান্তিরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, অবৈধ অর্থ পাচার, নিরাপদ অভিবাসন ও অভিবাসী অধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে টেকসই প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।
সফরকালে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন।
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কোফ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক অ্যামি পোপ, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া ইতালি, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কসভোর প্রতিনিধিদলের প্রধানের সঙ্গেও বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনও একাধিক বহুপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। এর মধ্যে রয়েছে কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সভা, পিসবিল্ডিং কমিশন মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠক, ‘জি-৭৭ ও চীন’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক, নারী-শান্তি ও নিরাপত্তা ফোকাল পয়েন্ট নেটওয়ার্ক, ওআইসি বার্ষিক সমন্বয় সভা, বিমসটেক, সিকা এবং এলডিসি মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠক।
