লন্ডনের হিথ্রো, ব্রাসেলস ও বার্লিন বিমানবন্দরে সাইবার হামলার পর তৎপর হয়েছে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সাইবার হামলা প্রতিরোধে বেবিচকে অনির্ধারিত বিশেষ বৈঠক হয়েছে গতকাল রবিবার। এরই মধ্যে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা হয়েছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
দেশের সব বিমানবন্দরেই সাইবার হামলার আশঙ্কা করছে অ্যাভিয়েশন-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের প্রতিবেদন নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা হয়েছে গতকালের বৈঠকে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে বোর্ডসভা হয়েছে, তাতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সাইবার হামলার বিষয়ে অ্যাভিয়েশন-বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোয় সাইবার হামলায় আমরা হতবাক হয়েছি। কারণ তারা খুবই সতর্ক ও সচেতন। এর মধ্যেই হামলাকারীরা আক্রমণ করে বসেছে। এটি আমাদের জন্য অশনিসংকেত। এরপর আমাদেরও সচেতন হতে হবে। আমাদের অনেক শত্রু। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্র্ণ স্থাপনায় সাইবার হামলা চালাতে পারে। বিমানবন্দরে সাইবার হামলা প্রতিরোধে বেবিচককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য গতকাল রাতে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউরোপের কয়েকটি বিমানবন্দরে সাইবার হামলা ও হামলার ঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের বিমানবন্দরগুলোয় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ নজরদারি করা হচ্ছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সাইবার হামলার কারণে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম অচল হয়ে পড়েছিল ইউরোপে। চেক-ইন ও বোর্ডিং প্রক্রিয়া চালাতে হয়েছে ম্যানুয়ালি। বাংলাদেশেও এমন ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য আগাম সতর্কতা অবলম্বন করেছে বেবিচক।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, নির্দেশনা পেয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্র্ণ স্থানগুলোতে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে গতকাল।
বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাইবার হামলার ঝুঁকির সম্ভাব্য কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কী কী করা হচ্ছে, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হবে। বিমানবন্দরের ডিজিটাল সিস্টেমগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিতভাবে কাজ করার কৌশল বের করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেক-ইন ও বোর্ডিং সিস্টেম সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর সাইবার হামলার ঘটনায় ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আজ (গতকাল) অনির্ধারিত একটি বৈঠকও হয়েছে। কিছুদিন আগেও সাইবার হামলা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিষয়ে আরেকটি বৈঠক হয়েছে।’
বেবিচক সূত্র জানায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর বেবিচকের প্রধান কার্যালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সাইবার হামলার বিষয়ে। লন্ডনে কয়েকটি বিমানবন্দরে সাইবার হামলার জেরে বাংলাদেশের সব বিমানবন্দরে আগাম সতর্কতা জারি করতে বলা হয়েছে। বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালে জারি করা ডিজিটাল নিরাপত্তা (২) বিধিমালার ধারা ৭ (৩) অনুসারে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো বা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ডিজিটাল রিসোর্স ও ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি দেখা দিলে আগেই তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। গত ৩১ জুলাই সম্ভাব্য সাইবার হামলার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন ও জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি নির্দেশনা জারি করে। সম্প্রতি বেবিচকের ওয়েবসাইট সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। প্রায় দুদিন ওয়েবসাইটে কাজ করা যায়নি। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি জরুরি ভিত্তিতে বেবিচকের সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির মূল্যায়ন ও তা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে, যা ওই বৈঠকে বলা হয়। উপযুক্ত ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করতে বলা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আরও বাড়াতে গতকাল ‘বিশেষ বার্তা’ পাঠিয়েছে বেবিচক। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বেবিচক কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। বিমানবন্দরে কিছু নিরাপত্তার ঘাটতি আছে বলে বার্তায় বলা হয়েছে। ঘাটতি পূরণ করতে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০টির মতো বিমান সংস্থা বাংলাদেশে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি যাত্রী আসা-যাওয়া করছে। রানওয়েতে নিরাপত্তা বাড়াতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য আরও সরঞ্জাম কেনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
বেবিচক সূত্র জানায়, সাইবার হামলা প্রতিরোধ করতে একটি অনির্ধারিত জরুরি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে শাহজালাল বিমানবন্দর, সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্সসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিমানবন্দরের ডিজিটাল সিস্টেম, রাডার এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো নিয়মিত নিরীক্ষণ করতে বলা হয়েছে, যাতে করে কোনো অস্বাভাবিক কার্যকলাপ দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিমানবন্দরের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল। সাইবার হামলায় এসব কাজ বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
ওই সভায় বেবিচক সদস্য (নিরাপত্তা) বলেছেন, বিমানবন্দরসহ সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর সাইবার ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জারি হওয়া একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দুর্বল আখ্যায়িত করে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিমানবন্দরগুলো সাইবার হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিরোধের জন্য এখনই ব্যবস্থা না নিয়ে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনের আড়ালে ডলার, সোনা পাচারসহ নানা দুর্নীতিতে জড়িত হয়ে পড়েছেন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের ভেতর শুল্কমুক্ত দোকান ও পরিবহন কাউন্টার ঘিরেও চলছে নানা অনিয়ম। প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। বেবিচক অনুমোদিত ছয়টি বেসরকারি পরিবহন কাউন্টার আছে বিমানবন্দরে। বিভিন্ন পেশার কিছু ব্যক্তি বেবিচকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কাউন্টার লিজ নিয়ে ভাড়া দিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এভসেক ও এপিবিএনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এপিবিএনের অফিস নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে কেন্দ্র করে এভসেকের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত হয়েছে। এ বিষয়গুলো ভাবিত করার মতো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিমানবন্দরের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা যাতে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য নজরদারি বাড়ানোর কারণে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউরোপের কয়েকটি বিমানবন্দরে সাইবার হামলার পর আমরা সতর্ক হয়েছি। বেবিচক নানা দিকনির্দেশনাও দিয়েছে বলে জেনেছি।’