পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বীর নতুন লড়াই

স্পেন বনাম বেলজিয়াম

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

একদিকে ৬০৯ মিনিট ধরে অক্ষত থাকা এক রক্ষণভাগ, যেখানে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের প্রবেশ করাটাই যেন জুজু। অন্যদিকে কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নকআউট পর্বের শেষ তিন ম্যাচে ১২ গোল করে প্রতিপক্ষের বক্সে ঝড় তোলা এক আক্রমণভাগ। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে শুক্রবার স্পেন-বেলজিয়ামের শেষ আটের লড়াইটি কেবল দুটি দলের ২২ জন ফুটবলারের নয়; এটি আসলে মাঠের লড়াইয়ে একপক্ষের নিখুঁত রক্ষণাত্মক জ্যামিতির বিরুদ্ধে অন্যপক্ষের ক্ষিপ্র কাউন্টার অ্যাটাকের এক তীব্র কৌশলগত যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘ ১৭ বছর পর কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে এই দুই পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া তাই ফুটবলারদের গণ্ডি পেরিয়ে ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতার চেনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক বৈরিতাকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে ফিরিয়ে আনছে।

ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, ফুটবল মাঠে এই দুই দলের দ্বৈরথ মানেই এক মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২২ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে এই দুই পরাশক্তি। সেখানে জয়ের পাল্লাটা স্পেনের দিকেই ভারী; তারা জিতেছে ১২টি ম্যাচে, বেলজিয়াম জিতেছে ৫ বার এবং বাকি ৫টি লড়াই শেষ হয়েছে ড্রয়ের সমীকরণে। বিশ্বকাপে এই কোয়ার্টার ফাইনালের আবহেই ১৯৮৬ সালের আসরে পেনাল্টি শুটআউটের নাটকীয়তায় স্পেনকে স্তব্ধ করে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিল বেলজিয়াম। চার বছর পর, ১৯৯০ এর বিশ্বমঞ্চে ২-১ গোলের জয়ে সেই হিসাব চুকিয়েছিল স্প্যানিশরা। দীর্ঘ তিন দশক পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দুই দলের এই ২৩তম লড়াই তাই কেবল একটি সেমিফাইনালের টিকিট ফয়সালা করবে না, বরং পুরনো হিসাব-নিকাশ নতুন করে লেখার উপলক্ষও তৈরি করবে।

উত্তর আমেরিকার এই আসরে একদল টিকে আছে এক অভেদ্য নিরেট দেয়াল হয়ে। চলতি আসরে শুরুতে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে পথ চলা শুরু হলেও, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এখন পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি। তাদের গোলরক্ষক উনাই সিমন টানা ছয় ম্যাচে ক্লিন শিট রাখার এক নতুন রেকর্ড গড়েছেন। সঙ্গে ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রি যখন মাঝমাঠের সুতো বাঁধছেন, সেখানে উইং-এ লামিন ইয়ামাল তৈরি করছেন আক্রমণের ফাঁদ। শেষ ষোলোতে শক্তিশালী পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে বিদায় করে আসা দলটির প্রধান আত্মবিশ্বাস তাদের রক্ষণভাগ, যা প্রতিপক্ষের ভুলে কাউন্টার অ্যাটাকের কোনো সুযোগই তৈরি হতে দেয় না। পাউ কুবারসি ও আইমেরিক লাপোর্তেদের গড়া এই ব্যাক ফোর যেকোনো আক্রমণকে মাঝপথেই ধূলিসাৎ করে দিতে অভ্যস্ত।

ঠিক এই জায়গাতেই সেই রক্ষণাত্মক দেয়ালের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নিয়ে হাজির প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। টানা ১৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকা দলটি এই টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ১০০টিরও বেশি শট নিয়ে নিজেদের আক্রমণের ধার প্রমাণ করেছে। তবে এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে বেলজিয়ামের ড্রেসিংরুমে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। কোচ রুডি গার্সিয়া গত ম্যাচে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকু ও জেরেমি ডকুর মতো প্রতিষ্ঠিত তারকাদের শুরুর একাদশের বাইরে রেখেছিলেন। সেই সাহসী সিদ্ধান্ত কাজেও এসেছে; চার্লস ডি কেটেলিয়ারের জোড়া গোল এবং লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ডের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সহ-স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। তবে মাঝমাঠের মূল ভরসা আমাদু ওনানার এসিএল ইনজুরিতে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া এবং ডিফেন্ডার জেনো দেবাস্টের ফিটনেস পরীক্ষা বেলজিয়ানদের জন্য বড় এক ক্ষত।

এই কৌশলী লড়াই নিয়ে প্রতিপক্ষের খেলার ধরন খুব কাছ থেকে চেনা বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া বলেন, ‘স্পেন নিশ্চিতভাবেই ফেভারিট। তারা বল দখলে দুর্দান্ত এবং বল হারালেই দ্রুত প্রেসিং করে। সেখানেই ম্যাচের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে: আমাদের জানতে হবে কীভাবে তাদের ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গাগুলো দ্রুত কাজে লাগানো যায়।’

নিজের দলের ওপর আস্থা রেখে তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের এমন একটি দল রয়েছে যার গুণাবলি প্রতিপক্ষকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে এবং প্রত্যেকেই অনুধাবন করছে যে জয় সম্ভব।’

সোফাই স্টেডিয়ামের মাঠে আজ তাই নির্ধারিত হতে যাচ্ছে ফুটবলের কোন দর্শনটি শ্রেষ্ঠ; বলের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নাকি ফাঁকা জায়গার নিখুঁত ব্যবহার? নিরেট রক্ষণকে ভেঙে ক্ষিপ্র গতি শেষ হাসি হাসবে, নাকি সব আক্রমণ প্রতিপক্ষের দেয়ালে আছড়ে পড়ে চূর্ণ হয়ে যাবে, তা দেখার জন্য ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন লস অ্যাঞ্জেলেসের ঘড়ির কাঁটায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত