জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম বার্ষিক অধিবেশন শুরুর আগে গতকাল সোমবার ফ্রান্স-সৌদির উদ্যোগে দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান বিষয়ে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউ ইয়র্কে এই বৈশ্বিক সম্মেলনে কয়েক ডজন বিশ্বনেতা অংশ নেন। গাজায় ইসরায়েলের তীব্র আক্রমণের ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে এ সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এ সম্মেলন থেকে ফ্রান্সসহ আরও অন্তত পাঁচটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে পারে। তবে এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখাতে ইসরায়েলের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ইয়েভেট কুপার বলেছেন, স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিম তীরের কোনো অংশ জোরপূর্বক দখল করা যাবে না। পশ্চিম তীর নিয়ে ইসরায়েলকে সতর্কবার্তা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তি সৌদি আরবও। এদিকে, গাজা সিটিতে ইসরায়েলের হামলায় গতকাল সোমবার অন্তত ৩১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন শিশুসহ চারজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বলে জানিয়েছে লেবানন সরকার। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের গাজায় এখনো বন্দি থাকা জিম্মিদের ছবি প্রকাশ করেছে হামাস। এগুলোকে ‘বিদায়কালীন’ ছবি বলে উল্লেখ করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটির সামরিক শাখা। হামাসের ভাষ্যমতে, ইসরায়েল যদি গাজা নগরীতে স্থল অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে এই জিম্মিরা বিপদের মধ্যে পড়বেন।
দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে ঐকমত্য গড়ে তুলতে ফিলিস্তিনবিষয়ক এই শীর্ষ সম্মেলন এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে; গাজায় একটি যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের তীব্র আক্রমণের ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে এ সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই সম্মেলনের উদ্যোক্তা ফ্রান্স ও সৌদি আরব বলছে, এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে; আর না হলে দুই রাষ্ট্র সমাধানের ধারণা চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চলতি মাসে সাত পৃষ্ঠার একটি ঘোষণা অনুমোদন করেছে। এই ঘোষণায় দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের দিকে বাস্তব, সময় সীমাবদ্ধ এবং অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের নিন্দা করে একে আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র সমর্পণের আহ্বানও জানানো হয়েছে। এই প্রচেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা কুড়ায়। তারা সাধারণ পরিষদের এ প্রচেষ্টাকে ‘ক্ষতিকর’ ও ‘বিপজ্জনক প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেছে। রবিবার যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ফ্রান্সসহ আরও পাঁচটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পথে রয়েছে।
তবে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ইসরায়েলকে সতর্ক করে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ইয়েভেট কুপার বলেছেন, স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিম তীরের কোনো অংশ জোরপূর্বক দখল করা যাবে না। সোমবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার আগে কুপার বিবিসিকে এসব কথা জানিয়েছেন। কুপার বলেন, যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তটি ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন উভয়ের নিরাপত্তা, শান্তি ও ন্যায় রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, উভয়পক্ষের চরমপন্থিরা দুই রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে চাইছে, যা পুনরুজ্জীবিত করার নৈতিক দায়িত্ব যুক্তরাজ্যের। কুপার জানাননি কখন পূর্ব জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট জেনারেল পূর্ণ দূতাবাসে রূপান্তর হবে। তবে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া পর্যন্ত এটি চলবে। পশ্চিম তীরের কোনো অংশ দখল বা সংযুক্ত করার চেষ্টা করলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছে সৌদি আরবও। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের জন্য আকাশপথও বন্ধ করতে পারে সৌদি আরব। আব্রাহাম চুক্তিও হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। রবিবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার মুহূর্ত এসে গেছে। আজ, শান্তির আশা ও দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে শান্তির আশা ও বাঁচিয়ে রাখার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছি।
এদিকে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলায় গতকাল অন্তত ৩১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বিনত জবেইলে একটি ইসরায়েলি ড্রোন আঘাত হানার ঘটনায় তিন শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে তিন শিশুসহ চারজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বলে জানিয়েছে লেবানন সরকার। ফিলিস্তিনের গাজায় বন্দি জিম্মিদের ছবি প্রকাশ করেছে হামাস। এগুলোকে ‘বিদায়কালীন’ ছবি বলে উল্লেখ করে সশস্ত্র সংগঠনটি জানিয়েছে, ইসরায়েল যদি গাজা নগরীতে স্থল অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে এই জিম্মিরা বিপদের মধ্যে পড়বেন। বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে ৪৬ জিম্মির ছবি প্রকাশ করে হামাস। প্রতিটি ছবিতে রন আরাদের নাম লেখা ছিল। রন ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর একজন পাইলট। ১৯৮৬ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় তার যুদ্ধবিমান দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ভূপাতিত হয়। তাকে লেবাননের শিয়া গোষ্ঠীগুলো আটক করেছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। মরদেহও পায়নি ইসরায়েল। হামাসের আলুকাসেম ব্রিগেড লিখেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমি এবং সেনাপ্রধান ইয়াল জমিরের নতি স্বীকার করার কারণে গাজা নগরীতে অভিযান শুরুর সময় এই বিদায়ী ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। তবে এই জিম্মিদের কতজন মারা গেছে বা জীবিত আছেন, তা পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।
