ওসামান দেম্বেলেকে নিয়ে বার্সেলোনার সাবেক কোচ জাভি হার্নান্দেজ ২০২১ সালে বলেছিলেন, 'সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হতে পারে।' এই ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো তখন অনেকের কাছেই অতিরঞ্জন মনে হয়েছিল। কারণ দেম্বেলের ক্যারিয়ারজুড়ে চোট, শৃঙ্খলার অভাব, পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তাকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে দেখা গেল, জাভির সেই কথাই যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে—দেম্বেলে ব্যালন ডি’অর জিতে নিয়েছেন।
শেকড় ও পরিবারের ত্যাগ
১৯৯৭ সালের ১৫ মে, ফ্রান্সের নরম্যান্ডির ছোট্ট শহর ভারনঁতে জন্ম দেম্বেলের। তার বাবা-মা ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার অভিবাসী। বাবা উসমান সিনিয়র মালি থেকে আর মা ফাতিমাতা মৌরিতানিয়া-সেনেগাল বংশোদ্ভূত। আর্থিক কষ্ট আর সামাজিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তারা পরিবারকে গড়ে তুলেছিলেন ধৈর্য, সম্প্রীতি আর ঐতিহ্যের ভিত্তিতে।
দেম্বেলের ফুটবল জীবনের স্থপতি ছিলেন মা ফাতিমাতা। মাত্র ছয় বছর বয়সে উসমানকে নিয়ে যান রেন শহরে ফুটবলার মামা বাদু সামবাগের কাছে। মামা তাকে স্থানীয় ক্লাব মাদেলেইন এভ্রু’তে ভর্তি করান। সেখান থেকেই শুরু আনুষ্ঠানিক যাত্রা। মা শুধু পাশে ছিলেন না, বরং দেম্বেলের সব চুক্তি, ট্রান্সফার, সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রেন থেকে ডর্টমুন্ড, বার্সেলোনা থেকে পিএসজি—সব জায়গায় ছেলের ক্যারিয়ারের চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি।

বাবা উসমান সিনিয়র থেকেছেন আড়ালে, কিন্তু তার অবদানও ছিল নীরব ও গভীর। পরিবারের ভরণপোষণে কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং ছেলের ফুটবল স্বপ্ন পূরণে সবসময় সমর্থন দিয়েছেন।
চোট আর অস্থির সময়
রেনের হয় লিগ ওয়ানে ২০১৪ সালে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু দেম্বেলের। সেখান থেকে তিনি যান জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে। সেখান থেকে ২০১৭ সালে ১০৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে যোগ দেন বার্সেলোনায়। শুরুতেই হয়ে যান বিশ্বের অন্যতম দামি ফুটবলার। কিন্তু সেই উজ্জ্বল সূচনার পরেই নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার। ১৪ বার পেশীর চোটে প্রায় ৭৮৪ দিন মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। অনুশীলনে দেরি, রাতজাগা, গেম খেলা—এসব নিয়ে ক্লাব শৃঙ্খলাজনিত প্রশ্ন তোলে। ব্যক্তিগত শেফ থেকে ফিজিও নিয়োগ—সবকিছু দিয়েও তাকে ঠিক করতে চেষ্টা করে বার্সেলোনা।
এ সময় লিওনেল মেসি তাকে পরামর্শ দেন- দেম্বেলের ভাষায়, 'যদি স্বপ্ন পূরণ করতে চাই তবে আরও সিরিয়াস হতে হবে। তখন থেকেই আমি তাকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি, তার খেলার প্রতিটি খুঁটিনাটি শিখতে থাকি। প্রথম দিন থেকেই তার সঙ্গে দুর্দান্ত সংযোগ ছিল আমার। তিনি সবসময় আমাকে সঠিক পরামর্শ দিতেন এবং বুঝতে পারতেন কোন সময়ে আমার কী প্রয়োজন। আমার কাছে তিনি সর্বকালের সেরা, এক অনন্য খেলোয়াড়।'
২০২১ সালে মরক্কোয় রিমা এদবুশকে বিয়ে দেম্বেলের ব্যক্তি জীবনে পরিবর্তন এনে দেন। অচিরেই সন্তান জন্ম নেয়। দেম্বেলে আরও পরিণত হন। স্বাস্থ্যকর খাবার, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন, ফিজিওর সঙ্গে কাজ—সবকিছুই তাকে নতুনভাবে তৈরি করে।
পিএসজিতে নতুন দেম্বেলে
মেসি চলে যাওয়ার পর তার জায়গায় বার্সেলোনা দেম্বেলেকে ব্যবহার শুরু করে। ২০২৩ সালে মাত্র ৪৩.৫ মিলিয়ন ইউরোয় পিএসজিতে যোগ দেন দেম্বেলে। শুরুতে ছিলেন সহায়ক ভূমিকায়, কারণ কিলিয়ান এমবাপ্পে তখনও দলের মূল তারকা। কিন্তু এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার পরই শুরু হয় দেম্বেলের পুনর্জন্ম।
কোচ লুইস এনরিকে তখন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন, 'আমরা চাই তুমি আরও গোল করো, আরও স্বার্থপর হও।' সেই স্বাধীনতাই যেন তাকে মুক্ত করে দেয়। ফলস নাইন হিসেবে খেলতে গিয়ে তিনি পেলেন নতুন ভূমিকা—আক্রমণ সাজানো, সুযোগ তৈরি আর গোল করার একসঙ্গে দায়িত্ব।
২০২৪-২৫ মৌসুমে দেম্বেলে ছিলেন ইউরোপের সবচেয়ে ছন্দে থাকা ফরোয়ার্ড। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেন ৩৫ গোল ও ১৪ অ্যাসিস্ট, মোট ৫১ গোলে সরাসরি অবদান। তার নেতৃত্বেই পিএসজি জেতে লিগ ১, কুপ দে ফ্রান্স এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ**—তিনটি শিরোপা। পৌঁছে যায় ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালেও।

ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে অশ্রু
প্যারিসে ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন ট্রফি হাতে নেন দেম্বেলে, আবেগে কেঁদে ফেলেন তিনি। পরিবারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাদের ত্যাগ ছাড়া কিছুই সম্ভব ছিল না।
আজকের দেম্বেলে কেবল একজন ফুটবলার নন, বরং সংগ্রাম, পরিবার, ঐতিহ্য আর অধ্যবসায়ের প্রতীক। বাবা-মায়ের ভালোবাসা, মায়ের দৃঢ়তা, মেসির শিক্ষা, নিজের অধ্যবসায় এবং কোচদের সঠিক দিকনির্দেশনা—সব মিলেই তাকে এনে দিয়েছে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি।
জাভির সেই ভবিষ্যদ্বাণী তাই সত্যি হয়েছে। উসমান দেম্বেলে সত্যিই হয়েছেন বিশ্বের সেরা।
