লিওনেল মেসিকে নিয়ে ছবি বানালে এর থেকে ভাল ক্লাইম্যাক্স হতে পারত না। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলতে নামছেন মেসি। প্রতিপক্ষ স্পেন। রবিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১ টায় নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হয়তো শেষ হবে এক যুগের। কিন্তু এই সমাপ্তি তো অন্যভাবেও হতে পারত। আর্জেন্টিনা না হয়ে স্পেনের জার্সি পরে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলতে পারতেন মেসি।
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে মেসি জন্মেছেন বটে, কিন্তু তাঁকে মেসি বানিয়েছে স্পেন। নির্দিষ্ট করে বললে স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি। ২০০০ সালে ১৩ বছরের মেসিকে সই করাতে রোজারিও ছুটে গিয়েছিলেন বার্সার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ। হাতের কাছে কাগজ না পেয়ে একটি ন্যাপকিনে সই করিয়েছিলেন মেসিকে। সেই কাহিনি তো ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। দু’বছর আগে প্রায় ১০ কোটি টাকায় নিলাম হয়েছে সেই ন্যাপকিন।
পরের ২১ বছর বার্সায় ছিলেন- চার বছর জুনিয়র স্তরের পর ১৭ বছর সিনিয়র ক্লাবে। বার্সাকে কী দেননি মেসি। ফুটবলের যত ট্রফি হয় সব জিতিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার আগে স্পেন খোঁজ পেয়েছিল মেসির
রোজারিওতে গিয়ে মেসিকে সই করানোর মধ্যে দিয়েই স্পেন বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাদের নজর রয়েছে এই প্রতিভার উপর। উল্টো দিকে সে সময় মেসির নামই জানত না আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা। তার সুবিধা তুলতে চেয়েছিল স্পেন।
স্পেনের আইন অনুযায়ী, ১০ বছর সেদেশে থাকার পর কেউ সেখানকার নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকার দেশের কেউ দু’বছর থাকলেই তা করতে পারেন। তার অর্থ, সাবালক হওয়ার পর স্পেনের হয়ে খেলতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না মেসির। আর্জেন্টিনার হয়ে বয়সভিত্তিক স্তরে না খেলায় আরও সুবিধা হয় স্পেনের। সেখানকার ফুটবল সংস্থা মেসিকে সই করাতে মরিয়া ছিল।
একটি টেপের কাহিনী
সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে যার নাম, ‘দ্য ফরগটেন টেপ’। মেসিকে কীভাবে আর্জেন্টিনা চিনেছিল, এটি তারই কাহিনি। লা মাসিয়ায় খেললেও মেসির প্রথম ম্যানেজার হোরাসিও গাগিওলি ও বাবা হোর্হে মেসি বরাবর চাইতেন মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলুক। ঠিক সেই সময়ই স্পেনের যুব দলের কোচ গিনেস মেলেন্দেজ, বার্সার যুব দলের কোচ অ্যালেক্স গার্সিয়া ও মেসির সতীর্থ ভিক্টর ভাসজেজের মেসিকে স্পেনের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাব শুনে হোরাসিও ও হোর্হে ঠিক করে ফেলেন তাঁদের কী করতে হবে।
২০০২ সালে আর্জেন্টিনার কোচ মার্সেলো বিয়েলসা ও তাঁর সহকারী ক্লদিয়ো ভিভাস বার্সেলোনায় যান। সেখানে খেলা আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের ফুটবলারদের দেখতেই গিয়েছিলেন তাঁরা। মেসির কথা তখনও তাঁরা জানতেন না। হোর্হেরা বুঝে গিয়েছিলেন, এটাই শেষ সুযোগ। বার্সার এক সাংবাদিক সাউমে মারসেতের সাহায্যে মেসির বিভিন্ন ম্যাচের কিছু ঝলক একটি টেপে ধরে রাখেন তাঁরা। সেই টেপ পাঠানো হয় বিয়েলসা ও ভিভাসের কাছে। এই প্রসঙ্গে ভিভাস তথ্যচিত্রে বলেছেন, “মারসেত আমাকে একটা টেপ দেয়। বলে, ‘স্পেন এই ছেলেটাকে খেলাতে মরিয়া। কিন্তু ওর পরিবার চায় ও আর্জেন্টিনার হয়ে খেলুক। মারলে একটু দেখবেন।’ আমি টেপ চালিয়ে অবাক হয়ে যাই। ওর স্কিল দেখে মাথা ঘুরছিল।” সঙ্গে সঙ্গে বিয়েলসার কাছে যান ভিভাস। সবটা বলেন, বিয়েলসা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ছেলেটি কি ভাল খেলে? ভিভাস জানান, শুধু ভাল নয়, অবিশ্বাস্য ভাল খেলে।
প্রথম বার মেসিকে দেখে নিজের চোখতে বিশ্বাস করতে পারেননি বিয়েলসা। ভিভাস বলেছেন, “ওই টেপে মেসির পাঁচটা ম্যাচের ঝলক ছিল। আমাকে বিয়েলসা বলল, ‘দ্রুতগতিতে চালাচ্ছ কেন? স্বাভাবিক গতিতে চালাও।’ আমি ওকে বললাম, টেপ স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। ছেলেটা এতটাই দ্রুত, চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।”
সব ঠিক থাকলে ২০০৩ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ খেলতে পারতেন মেসি। কিন্তু বিয়েলসাদের পাঠানো টেপ আর্জেন্টিনায় পৌঁছোয় দু’মাস পর। তত দিনে বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৭ কোচ হুগো টোকালি দল বদলাতে চাননি। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপের ১৫ দিন আগে টেপটা হাতে পেয়েছিলাম। মেসির খেলা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেও দল বদলাতে চাইনি। কারণ, যারা ছিল, তারা দু’বছরের পরিশ্রমের পর জায়গা পেয়েছিল। মেসিকে ঢোকাতে আমি ওদের কাউকে বার করতে চাইনি।”
আর্জেন্টিনার হার, স্পেনের রাঁধুনির খোঁচা
সেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছেই হারতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। বার্সায় মেসির সতীর্থ ও সাবেক স্প্যানিশ ফুটবলার সেস ফাব্রেগাস জোড়া গোল করেছিলেন। ম্যাচ শেষে টোকালিকে খোঁচা মেরেছিলেন স্পেনের রাঁধুনি। টোকালি জানান, “রাতে আমরা খেতে বসেছিলাম। পাশেই স্পেনের দল খাচ্ছিল। ওদের রাঁধুনি আমাকে এসে বলল, ‘আপনি যদি বার্সেলোনা থেকে ওই ছেলেটাকে আনতেন, তা হলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরতেন।’ তা শুনে ওকে বলি, “কার কথা বলছেন? মেসি।” সেটা শুনে আরও অবাক হয়ে রাঁধুনি বলেন, “আপনি ওকে চেনেন। তাও খেলাননি!”
এই কথা ধাক্কা দিয়েছিল টোকালিকে। সারা রাত ঘুমোতে পারেননি। পরের দিন আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থাকে জানিয়েছিলেন, যেভাবেই হোক মেসিকে সই করাতে হবে। তা শুনে ফুটবল সংস্থা জানিয়েছিল, আর্জেন্টিনায় তারা একটি ম্যাচের আয়োজন করবে। সেখানে একজন আন্তর্জাতিক মানের রেফারি থাকবেন। সেখানেই দেখে নেওয়া যাবে মেসিকে।
রোজারিওতে মেসির পরিবারে ফোন
মেসিকে সই করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেও তাঁর সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবেন, তা বুঝতে পারছিলেন আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার কর্তারা। কারণ, তাঁদের কাছে ফোন নম্বর ছিল না। বাধ্য হয়ে একটি বুথে গিয়ে রোসারিয়োর সব মেসি পরিবারে ফোন করেন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ম্যানেজার ওমার সৌতো। তিনি বলেন, “মেসির পরিবারকে কেউ চিনত না। ফোন নম্বরও ছিল না। তাই আমি একটা বুথে গিয়ে রোজারিওর ফোন ডায়েরি হাতে নিই। সেখানে মেসি নামের সকলকে ফোন করি। অবশেষে মেসির ঠাকুমার সঙ্গে কথা হয়। ওঁর কাছ থেকে মেসির কাকা ও তাঁর কাছ থেকে মেসির বাবার নম্বর পাই। ওঁকে বলি, আমি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে ফোন করছি। লিওনার্দো মেসির সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
মেসির নাম বলতে ভুল করেন সৌতো। তা শুনে জর্জে বলেছিলেন, “যাক, শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের কথা মনে হল। ও আর্জেন্টিনার হয়েই খেলতে চায়। তবে ওর নাম লিওনার্দো নয়, লিওনেল।”
নামের ভুলে মেসি বাদ
শুধু এক বার নয়, দু’বার ভুল করে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা। তারা বার্সাকে যে ফ্যাক্স পাঠায় সেখানে মেসির পদবির বানান ভুল করে। ফলে মেসির বদলে তা হয়ে যায় ‘মেকি’। বার্সা জানিয়ে দেয়, এই নামে কোনও ফুটবলার নেই সেখানে। সেটা শুনে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা ভাবে, ইচ্ছা করে মেসিকে ছাড়তে চাইছে না স্পেন। তাতে আরও যোগাযোগ শুরু করে তারা। মেসির বাবার সঙ্গে কথা বলেন সংস্থার প্রেসিডেন্ট। নামের বানান ভুল না করলে হয়তো এতটা মরিয়া হয়ে উঠতেন না তাঁরা।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা স্টেডিয়ামে সেই ‘বাহানা ম্যাচ’
মেসিকে চিরতরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বেঁধে ফেলার জন্য ২০০৪ সালের ২৯ জুন তড়িঘড়ি করে প্যারাগুয়ের অনূর্ধ্ব-২০ দলের বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করে আর্জেন্টিনা। ডিয়েগো ম্যারাডোনা স্টেডিয়ামে (তৎকালীন আর্জেন্টিনোস জুনিয়রস) মাত্র কয়েকশ দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ১৭ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামেন লম্বা চুলের ১৭ বছর বয়সী মেসি। ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৮-০ ব্যবধানে জেতে, যেখানে বদলি হিসেবে নেমে মেসি ১টি চোখ ধাঁধানো গোল এবং ২টি অ্যাসিস্ট করেন।
মেসির ইচ্ছা কি ছিল
আত্মজীবনী ‘মেসি, দ্য প্যাট্রিয়ট’-এ মেসি লিখেছেন, ছোট থেকে একটি দলের জার্সি পরাই তাঁর স্বপ্ন ছিল, “ছোট থেকেই ভাবতাম আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা আমাকে ডাকবে। আমি সব সময় আর্জেন্টিনার জার্সিই পরতে চেয়েছি। স্পেনে বসেও টেলিভিশনে আর্জেন্টিনার খেলা দেখতাম। মাঠে গিয়ে দেখার সুযোগ কোনও দিন হয়নি। কিন্তু একটাই স্বপ্ন ছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলব।”
২০১০ সালে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মেসিকে সই করাতে কতটা মরিয়া ছিলেন তাঁরা, “আমি সব রকম চেষ্টা করেছি, যাতে মেসি স্পেনের হয়ে খেলে। কিন্তু ও বার বার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজের দেশকেই ও ভালবেসেছে।”
সেই দেশের হয়েই আজ রাতে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে নামবেন মেসি। সম্ভবত শেষবারের জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দেখা যাবে তাঁকে। আরও একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ করতে চাইবেন তিনি। কিন্তু মেসির সেই স্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে স্পেন। আর একটু হলে যে দেশের হয়েই হয়তো খেলতে হত তাঁকে। আর্জেন্টিনা হারাত তাদের অন্যতম সেরাকে।