ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অপমানিত হননি!

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৫৯ এএম

কবি, মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সেই কবিতাটা মনে পড়ে, ‘পাখী সব করে রব/ রাতি পোহাইল/ কাননে কুসুম কলি/ সকলি ফুটিল’! রাত পোহাইলে পাখির ডাক তো শোনা যায়-ই। এই পাখিদের মধ্যে কাকও কিন্তু এক ধরনের পাখি। রাত পোহালে কাকের ডাকও শুনি। কাক যদিও কোকিল না। বাজপাখিও না। তবে পাখি তো বটে। চড়ুই পাখিও তো পাখি! কিন্তু কোন পাখির ডাক ভালো লাগে! এটা নিয়ে বিভিন্ন মতামত আছে। সকালবেলা মোরগের ডাক শুনলেও অনেকের কাছে ভালো লাগে। হতেই পারে। মিডিয়াতেও হারহামেশা ইদানীং আমরা যে ডাক শুনি সেগুলো কোন ধরনের পাখি! চড়ুই পাখি না বাজপাখি! বাবুই না কোকিল! সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ সভাতে দেশ-বিদেশের অনেক পাখি এসে ভিড় করেছিল। তাদের কারও ডাক অধীর আগ্রহ নিয়ে অনেকেই শুনেছে। কারও ডাক শুনে অনেকে হল ত্যাগ করে চলে এসেছে। তাতে কি তাকে আমরা অসম্মান করতে পেরেছি কি-না! উল্লিখিত অধিবেশনে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু ভাষণ দেন। অনেকের মতে, তার ভাষণ চলাকালে প্রতিবাদে মিলনায়তন ছেড়ে অনেকেই বেরিয়ে যান। তাতে কি! এই গণতান্ত্রিক অধিকার জাতিসংঘে সব রাষ্ট্রের ও ব্যক্তির তো আছেই। কোনো রাষ্ট্রনেতার ভাষণের সময় সব সদস্য উপস্থিত থাকলেই কি ধরে নেওয়া যায় যে, সেখানে কারোর সম্মান বেড়েছে! তাহলে জাতিসংঘের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের সময় পুরো মিলনায়তন ভরা ছিল। তার মানে কি, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মানিত হয়েছেন এতে! বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেও দেখতে পারি।

 এই যুগেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্মান, অসম্মান নির্ধারণ হয় যার হাতে যত শক্তি বেশি, ‘ক্ষমতা’ বেশি তার ও তাদের ওপর। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বিষয়টাকে যেভাবে দেখি সেভাবে সমাজ, রাষ্ট্র বা বিশ্বে এখন সম্মান, অসম্মানের বিষয়টা নির্ধারিত হয় না যদি না তার কোনো কার্যকরী ভূমিকা না থাকে। বিশ্বের প্রায় ১৯৩টা দেশের মধ্যে এ পর্যন্ত ১৫৭টা দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবার। নিঃসন্দেহে এটা ফিলিস্তিনিদের জন্য একটা সম্মানের বিষয় তো বটেই। কিন্তু এই সম্মানের কার্যকরী ভূমিকা যদি প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে এই সম্মানের মূল্য কি! সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরার’ এক সাংবাদিকের কাছে কিছুদিন আগে এক ফিলিস্তিনি নাগরিক ফিলিস্তিনকে বিশ্বের অনেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার খবর শুনে বলেন, তাতে কি আমার মৃত সন্তান ফিরে পাব! এখন আমার অনেক ক্ষুধা। গত প্রায় এক সপ্তাহ খেতে পারছি না। ঘরে আমার পঙ্গু স্বামী। তার জন্য সামান্য চিকিৎসার কোনো সম্ভাবনা দেখি না। এক মগ খাবার পানিও পাই না কোথাও। এর কি কোনো সমাধান হবে! এমনি অসংখ্য বাস্তব চিত্রের সঙ্গে ফিলিস্তিনকে, কে স্বীকৃতি দিল, কে দিল না। বিষয়টা মানবিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে অর্থহীন বলে মনে হয়। একইভাবে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণ শুরু করার সময় লক্ষ করা গেছে সেখানে অনেক রাষ্ট্র ও তাদের প্রতিনিধিরা অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে চলে গেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়া বিষয়টাকে ক্যামেরাতে ধরেন এবং তাদের বর্ণনায় উল্লেখ করেন এতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু, তাকে অপমান করা হলো। তাই কি!

কারণ, প্রথমত এতে ইসরায়েলের কোনো কিছু যায় আসে না। আসবে বলেও মনে হয় না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী তবু তার নির্ধারিত ভাষণ দিয়েছেন। এবং সেখানে তিনি তীব্র ভাষায় গতানুগতিকভাবে যারাই ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেন, এর তীব্র নিন্দা করেন ও সমালোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনারা ইউরোপের যেসব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, তারা মূলত বড় রকমের ভুল করছেন এবং আপনারা পক্ষান্তরে ইহুদি হত্যাকে উৎসাহিত করছেন। তিনি আরও বলেন যে, কোনো সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আমাদের গলায় ছুরি বসাবে আর আমরা সেটা মেনে নেব! কোনোভাবেই সেটা হবে না। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তোলা হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে, তাকে তিনি সন্ত্রাসী হামাসের ষড়যন্ত্র ও মিডিয়ার ভুল ব্যাখ্যা বলে অভিহিত করেন। তার মতে গাজার সঙ্গে ইসরায়েলের এই লড়াই ইসরায়েলের বেঁচে থাকার ও অস্তিত্বের লড়াই। তিনি আরও উল্লেখ করে বলেন যে, অনেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র বাইরে থেকে আমাদের নিন্দা করছেন কিন্তু ভেতরে আমাদের প্রশংসা করছেন আমরা যা করছি তার প্রতি সমর্থন দিয়ে। উল্লেখ্য যে, ইউরোপের অনেক রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরোধিতা করলেও তারা ইসরায়েল থেকে অনেক রকম সামরিক ও বেসামরিক অস্ত্র ক্রয় করে যাচ্ছেন নিয়মিত। ইসরায়েলের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি ও মিলিটারি যুদ্ধকেও ইউরোপ এভাবেও সম্মান করে বলা যায়। ইসরায়েল একটা ছোট্ট রাষ্ট্র হয়েও বর্তমান বিশ্বে তার বাণিজ্যশক্তি কিন্তু এতটুকুও কমেনি। শুধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় কিছু রাষ্ট্র তাদের স্থান ত্যাগ করলেই কি তাকে অপমানিত করা যায়! বর্তমান বিশ্বে কারও সম্মান বা মান, যাই বলি না কেন। নির্ধারণ করে দেয় কে? এক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প কে ও কী?  ব্যতিক্রম তো আছেই। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই ইসরায়েলের পক্ষে এবং এখনো শর্তহীনভাবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এবারকার জাতিসংঘের অধিবেশনের ভাষণে গাজা উপত্যকায় এভাবে হত্যাযোগ্য চলতে দেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন। বাস্তবে সেটা প্রমাণ হয়নি কিন্তু। প্রায় আড়াই বছর ইসরায়েল গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল কর্র্তৃক ফিলিস্তিন ও গাজা অধিবাসী নিহত হয়েছেন প্রায় ৬৬ হাজার। আহতদের সংখ্যা দেড় লাখের ওপরে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গ্রেপ্তারের হুলিয়া থাকলেও বেনজামিন নেতানিয়াহু এখনো মুক্ত অবস্থায় ঘোরাফেরা করছেন দুর্দান্ত দাপটে। তার বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধনের’ মামলা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আদালত কোনো কিছুই করতে পারছে না। না পারছে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করতে, না পারছে নিরপরাধ হাজার হাজার গাজা অধিবাসীকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর হাত থেকেও বাঁচাতে। না পারছে গাজা অধিবাসীদের কোনো মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। এসব বিবেচনায় যদি কেউ মনে করি, জাতিসংঘের অধিবেশনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় মিলনায়তন ছেড়ে গেলেই তাকে অপমান করা হলো! এটা আবেগ, বাস্তবতা না।

আবেগের রাজনীতি, আবেগের পৃথিবী কোনো সম্মান ধারণ করতে পারে না। পুঁজিবাদী বিশ্ব এক ধরনের জোর যার মুল্লুুক তার। এই নীতিমালায় সব সম্মান ও অসম্মানের সংজ্ঞা বদলে দেয়। এটা সত্য যে জাতীয় ভাবাবেগ একটা বাস্তব সত্য। সবারই বিষয়টা বিবেচনা করা উচিত। এ ব্যাপারে আগ্রাসী পর্যায়ে গিয়ে কোনো স্বাধীনতা বা সম্মান অর্জন সম্ভব না। কিন্তু এই অসভ্য নীতি ধারাই চলছে বর্তমান সভ্যতায়। এ ব্যাপারে দার্শনিক রাসেল মনে করেন, দলগত প্রেরণা থেকে উদ্ভূত নৈতিক বিবেচনার সীমা সংকীর্ণ, এবং সেটা প্রায় সবসময়ই ক্ষতিকর। এতে মানুষকে কেবল নিজের দলের স্বার্থে যা ভালো তাকেই ভালো বলে স্বীকার করে; আর কোনো জিনিস যদি সমগ্র মানবজাতির পক্ষে কল্যাণকর হওয়া সত্ত্বেও তার নিজের দলের স্বার্থহানি ঘটায়, তাহলেই সে তাকে খারাপ বলে নির্দেশ করে। এই দলীয় অনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধের সময় প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ পায় এবং তখন তা মানুষের সাধারণ চিন্তাকেও সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সভ্যতার এই কান্না শুনতে পাই কি! যদি না পাই তাহলে কিছু পোশাকি আচার-আচরণ দিয়ে না পারা যায় কাউকে সম্মান করতে না পারা যায় কাউকে অসম্মান করতে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বর্তমান ইসরায়েল, আমেরিকা, নর্থ কোরিয়া, ভারত। এ রকম আরও কয়েকটা দেশে নতুন করে এক ধরনের জাতীয়তাবাদের উগ্র সংস্কৃতি স্বদেশপ্রীতি নামে চালু। বর্তমান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু তেমন একটা সাংস্কৃতিক জটিল দ্বন্দ্ব ও মনস্তত্ত্বে তার সাধারণ ভবিষ্যৎ জ্ঞানকেও লুপ্ত করেন। এর পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ, সেটা ইসরায়েলের নাগরিকরা কতটা অনুধাবন করেন এখন বোঝা কঠিন। ইসরায়েল নাগরিকের এই অনুধাবনের কার্যকারিতায় নেতানিয়াহুকে তার প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার প্রশ্নে শিক্ষা দিতে পারলেই তাকে রোধ করা যেতে পারে। 

ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর সম্মানে প্রকৃতপক্ষে তখনই আঘাত হবে যখন ইসরায়েলের নাগরিকরা তাকে তারা বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি বা অপসারণ করবেন। আন্তর্জাতিক আদালতে তার বিচার হবে এবং নিরপরাধ মানুষ হত্যার জন্য তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। আরেক ভাবেও তাকে অপমান করা যেতে পারে, সেটা বিশ্বে সব রকম ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের মধ্য দিয়ে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বে সব অর্থনৈতিক অবরোধ দৃঢ় করা। কেন জানি ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, যারা চেঁচামেচি করে সেদিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় মিলনায়তন ছেড়ে গেছেন, তারা অনেকটা চড়ুই পাখির মতো ক্ষীণ স্বরে ডেকেছেন। সেই ডাকে কি প্রমাণ হয় যে এতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অসম্মান করা গেছে! এই সভার বাজপাখি তো যুক্তরাষ্ট্র। সে কিন্তু কোনো ডাক দেয়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কে বা কারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনল বা কারা শুনল না। কিংবা নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তাকে অপমান করা গেল কি-না! এই প্রশ্নের জবাব কিন্তু মেঘের আড়ালে থেকে যায়। সেদিনের অনুষ্ঠানে যদি বিশ্বের সব মিডিয়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রচারে বিরত থাকত। এবং সেটা নিয়ে যদি কোনো পত্রপত্রিকায় কিছুই না লেখা হতো হয়তো তাহলে তিনি কিছুটা অসম্মানিত হতে পারতেন। তার পরিবর্তে অন্য সবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আরও বেশি আলোচিত হয়েছেন। বর্তমান প্রচারেই প্রসার জগতে, তিনি লাইট, ক্যামেরা ও অ্যাকশনেই থাকলেন। এর নাম কি ‘অসম্মান’! তাহলে সম্মান ও অসম্মানবোধের জগতে, আমি নির্বোধ।

লেখক: সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত