ইসির মেরুদন্ড চান সুধীজন

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৫৮ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা, অপতথ্য ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে না পারলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ব্যাহত হতে পারে মনে করেন বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা, মেরুদন্ড শক্ত রেখে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারলে ইসি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তবে গতানুগতিক ধারায় নির্বাচন হলে বিগত কমিশনের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে।

গতকাল রবিবার নির্বাচন ভবনে আয়োজিত সংলাপে বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ করছে ইসি। ধারাবাহিক বৈঠকের প্রথম দিনে দুই দফায় শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সংলাপ করে তারা। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনসহ চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে অনেক কাজ সম্পন্ন করেছি। তার মধ্যে বিশাল একটা ভোটার তালিকা, তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শেষ করেছি। নারী ভোটার ব্যবধান কমিয়েছি। নয়টি আইন আমরা সংশোধন করছি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা প্রস্তুতি নেওয়ার, তার অনেক কিছু এগিয়ে নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘যারা জাতীয় নির্বাচন নস্যাৎ করতে চায়, তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। তাই আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকতে হবে। জাতীয় নির্বাচন সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। ইসি একা নয়, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজসহ সবার অংশগ্রহণ জরুরি। আপনারা আমাদের দূত হয়ে কাজ করবেন। আমাদের লক্ষ্য একটি ফ্রি, ফেয়ার এবং ক্রেডিবল নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রাশেদা কে চৌধূরী বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। তাদের বড় চ্যালেঞ্জটাই হবে এ প্রত্যাশা ম্যানেজমেন্ট-এক্সপেক্টেশনটা ম্যানেজ করা। সেটা ধরুন তরুণ প্রজন্ম যেমন ছিল, আমরাও যারা প্রবীণ আছি সবাই একবাক্যে বলেছি, এটা একটি বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা। কিন্তু শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না, সাহসও লাগবে। একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার সাহস থাকতে হবে। যাতে শ্রমজীবী মানুষও নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারে, উদ্যোক্তারাও যেন ভোট দিতে পারে।’ এ সময় তিনি মব ভায়োলেন্স নিয়ে শঙ্কার প্রকাশ করেন।

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে গিয়ে যদি সরকার কোনো বাধা সৃষ্টি করে, তবে সেটি প্রকাশ্যে মিডিয়ার সামনে তুলে ধরা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হবে। আমরা বলেছি, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কিছুটা সংকুচিত অবস্থায় আছেন। তারা যেন ঠিকমতো ভোট দিতে পারেন। ভোট দেওয়ার পর নারী ও জাতিগত ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।’

সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, ‘এতদিন আমরা দেখে এসেছি যে, সরকার নির্বাচন কমিশনের ওপর খবরদারি করেছে। আমরা বলেছি, নির্বাচন কমিশনকে এই শক্তি অর্জন করতে হবে, এই সাহস অর্জন করতে হবে যাতে তারা সরকারকে খবরদারি করতে পারে।’

টিআইবির পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, “মনোনয়নপত্র দাখিল ও হলফনামায় তথ্যের যাচাই-বাছাই করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেম আমাদের নেই। আমার মনে হয় এটা আমাদের যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা যেন সব আসনেই থাকে।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মনে করিয়ে দেন, তরুণ প্রজন্ম এখন ভিন্ন প্রত্যাশা নিয়ে এগোচ্ছে। তাদের আস্থা অর্জনে ইসিকে উঁচু নৈতিক মানদন্ড বজায় রাখতে হবে। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি জায়িফ রহমান জানান, নির্বিঘ্ন ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ইসি দৃশ্যমান উদ্যোগ নিলে জনগণের মধ্যে ভরসা বাড়বে ইসির প্রতি। মিস ইনফরমেশন, এআই জেনারেটেড তথ্যের অপব্যবহার রোধে তৎপরতা থাকার অনুরোধ তার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেছেন, ‘নির্বাচনে যারা হারবেন তারা অসন্তুষ্ট থাকবেন, তাই আগে থেকেই সেফগার্ড ব্যবস্থা নিতে হবে। যত বেশি সম্ভব ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের উপস্থিতি স্বাধীন যাচাইয়ের জন্য জরুরি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, ‘সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য কার্যকর গণমাধ্যম অপরিহার্য। এজন্য সম্পাদক, নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধিদের নিয়ে গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। পাশাপাশি আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।’

এ সময় নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণবিধি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, পাশাপাশি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনীও প্রেরণ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রবাহ সীমিত না করে বরং ভালো তথ্যের মাধ্যমে খারাপ তথ্যকে মোকাবিলা করাই হবে কমিশনের কৌশল। যদিও অনেক ভুয়া প্রচারণার উৎস দেশের বাইরে বা অচিহ্নিত, তারপরও যাদের শনাক্ত করা সম্ভব, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া গণমাধ্যম নীতিমালা ইতিমধ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে; সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং শিগগির সম্পাদকদের সঙ্গে আলোচনায় বসা হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান বলেন, ‘নির্বাচনে নানা প্রতিবন্ধকতা, প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা ও নিষিদ্ধ দলের উসকানি থাকতে পারে, তবে এসব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অঙ্গীকার থাকলে সব সংকট অতিক্রম করা সম্ভব।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. এএসএম আমানুল্লাহ নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের ভেতরে ও বাইরে নির্বাচন নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা বিরাজ করছে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে সেই অনিশ্চয়তা দূর হবে। এতে দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন বা সন্দেহ রয়েছে, তাও কেটে যাবে।’

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) তাহমিদা আহমদ বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৯ কোটি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায়ই রয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ মানুষ। জনসংখ্যা নিয়ে বিবিএসের ডেটা প্রশ্নবিদ্ধ। একবার তারা যেটা প্রকাশ করল, পরে আবার সেটা কমিয়ে দেখানোর জন্য বলা হয়েছে।’

সংলাপে তিনি বলেন, ‘আমরা যে ভোটার তালিকা করলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে, সেখান থেকে তথ্যটা পেয়েছি। এটা একদম ঠিক তথ্য। আমাদের লোকসংখ্যা হলো ১৯ কোটি। এর মধ্যে ১ কোটি ৫১ লাখ বাইরের, প্রবাসী যেটাকে বলা হয়। শুধু ঢাকায় রয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ মানুষ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত