দেশীয় ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ কোম্পানির সম্পদ জব্দ করতে হবে

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:৪২ এএম

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন বলেছেন, গত কয়েক বছরে আর্থিক খাতে আমরা অনেক অলিগার্ক তৈরি করেছি। শত শত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৈরি হয়েছে। ১০-১২টা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের সম্পদ জব্দ করে রাষ্ট্রীয় খাতে নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে হবে। তবে গণহারে সবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা কোনো সমাধান নয়। এই ১০-১২ জনের অ্যাকাউন্ট জব্দের বাইরে কারও এভাবে জব্দ করা উচিত নয়। এটি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলমের সভাপতিত্বে এতে অতিথি ছিলেন মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি কামরান টি. রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. আশিকুর রহমান।

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন বলেন, আমি প্রথমবারের মতো দেখলাম সরকার তার প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার ক্রয় করতে পেরেছে। মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দৌরাত্ম্যের কথা উল্লেখ করে সাবেক এ গভর্নর বলেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা মধ্যস্বত্বভোগীরা। এদের নিয়ন্ত্রণে কো-অপারেটিভ থাকতে হবে।

ব্যাংক একীভূতকরণের বিরোধিতা করে ফরাসউদ্দীন বলেন, দুই বছর আগে আমি শক্তভাবে বিরোধিতা করে বলেছিলাম এটি কোনোভাবে ভালো আইডিয়া নয়। গভর্নরের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা ব্যাংক চালান বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের অনেক কম কথা বলতে হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বড় দুর্নীতি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের উন্নতি যথেষ্ট হয়েছে। অতি সম্প্রতি দেশে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক বিষয় আছে। তবুও এখানে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের মুদ্রানীতি খুব সাহসের সঙ্গে করতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে কর-জিডিপি অনুপাতে। আমাদের অর্থনীতি এত বড় হয়েছে, যার সিংহভাগ বিত্তবানদের কাছে গেছে।

এ সময় রিজওয়ান রহমান ফরাসউদ্দীনের উদ্দেশে বলেন, বারবার যে শব্দটি আসে সেটি সুশাসন। যদি সত্যিই সুশাসন থাকত, তবে ফরাসউদ্দীনের জীবদ্দশায় তার উত্তরসূরিরা কি পালিয়ে যেতে হতো? এটা হাস্যকর।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক এ সভাপতি বলেন, এখন অর্থনীতি স্থিতিশীল, তার মানে এটি নয় যে, অর্থনীতি খুব ভালো হয়ে পড়েছে। অতীতে যে অবস্থা হয়েছে, সেখান থেকে নিচে নামার আর অবস্থা ছিল না। বিগত সরকারের সময়ে আমি সাড়ে আট শতাংশে ঋণ নিয়েছিলাম, এখন তা সাড়ে ১৭ শতাংশে ফেরত দিতে হচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ প্রসঙ্গে রিজওয়ান রহমান বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইন করা হয় করার জন্য, মানার জন্য না। জবাবদিহিতার জন্য আলাদা ইনস্টিটিউশন তৈরি করতে হবে। এত স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় কোনো জবাবদিহিতা নেই। তাদের নিয়োগ দেওয়াই হয় লুটপাটের জন্য।

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদের গভর্নিং বডির সদস্য খন্দকার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে আবারও ইস্ট ইন্ডিয়া তৈরি হবে, আবারও লুটপাট হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অ্যাক্ট পাস করতে হবে।

তিনি বলেন, কিভাবে এসব অলিগার্ক তৈরি করেছি, সেটিও দেখা দরকার। ষাটের দশকে অন্য একটি দেশ আমাদের সম্পদ বৈষম্য করত। এখন নিজেদের লোকেরাই লুটপাট করে। আমি পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে জানিয়েছি, আপনারা চার ফার্স্টবয় থাকতে ইঁদুর যদি পালিয়ে যায় তাহলে আর ধরতে পারবেন না।

ড. আশিকুর রহমানের উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতিপথ দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর্থিক বছর ২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯৭% এ নেমে এসেছে। সতর্ক আর্থিক ও রাজস্ব নীতির কারণে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগকারীদের নিম্ন মনোভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধাসহ প্রতিকূল কারণগুলো অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই মন্দা বিনিয়োগ, শ্রমবাজারের কর্মক্ষমতা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টার ওপর প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরে। সামাজিক অস্থিরতা, বন্যা, দুর্বল বিনিয়োগ এবং কঠোর নীতিগত অবস্থানের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর ২০২৬-২৭ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামান্যভাবে ৫.৪% এ ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত