ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ২২৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পটি শেষ করতে আরও ৪২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ জেট ফুয়েল পাইপলাইন নির্মাণে দুই বছরের প্রকল্পটি ২০১৯ সালের শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন ২০২৭ সালের আগে শেষ হচ্ছে না। এর মধ্যে দুই প্রকল্প পরিচালক অবসরে চলে গেছেন।
‘জেট এ-১ পাইপলাইন ফ্রম পিতলগঞ্জ (কাঞ্চন ব্রিজের নিকট) টু কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপো (কেএডি) ইনক্লুডিং পাম্পিং ফ্যাসিলিটিজ’ নামের এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে বাস্তবায়ন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল পিএলসি।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে সড়কপথে জ্বালানি তেল পরিবহন করে বিমানবন্দরের কাছে বিপিসির কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপোতে নেওয়া হয়, যা পরে উড়োজাহাজে সরবরাহ করা হয়। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে জ্বালানি পরিবহনে বছরে ৫০ কোটি টাকা ভাড়া এবং ২০ কোটি টাকা পরিবহন ক্ষতি মিলে মোট ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এ ছাড়া যানজট, হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘটের মতো ঝুঁকি রয়েছে। এসব সমস্যা বিবেচনায় জ্বালানি তেল সহজ, নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ীভাবে সরবরাহের লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি নিয়ে এখন নানা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়। পাইপলাইন নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট ও কনস্ট্রাকশন) ঠিকাদার হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান নৌ-কল্যাণ ফাউন্ডেশন ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড (এনকেএফটিসিএল) নিয়োজিত ছিল। প্রাথমিকভাবে ২২৮ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে ১৮৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ইপিসি কাজে এবং বাকি অংশ ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়। পরে দফায় দফায় ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির পরও কাজ শেষ না হওয়ায় সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে।
পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, বাকি কাজ সম্পন্ন করতে একটি খসড়া ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে, যা বর্তমানে মন্ত্রণালয় ও বিপিসির হেফাজতে রয়েছে।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠিকাদার মাঝপথে কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যাওয়ায় নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বাকি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তবে, চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।’
কাজের অগ্রগতি ও বিল পরিশোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগের হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পের ৪২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে, সম্পন্ন কাজের তুলনায় ঠিকাদারকে কম বিল দেওয়া হয়েছে। বাকি বিলের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রসঙ্গে আমীর মাসুদ বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদারের পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তারা আদালতে যায়। আদালত পিজি বাতিলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং প্রয়োজনে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের অনুমতি দেয়। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’
প্রস্তাবিত ডিপিপিতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগের ঠিকাদার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কাজ চালিয়ে যায়নি। ফলে বর্তমানে ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে।’
যদিও প্রতিযোগিতা ছাড়াই প্রকল্পের কাজ চূড়ান্ত করার পরও দুই দফায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন কী ভিত্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছিল এবং এখন কী বিবেচনায় দর নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। প্রকল্প শুরুর পর থেকে দুই প্রকল্প পরিচালক অবসরে গেলেও কাজ অসম্পূর্ণ। সম্প্রতি নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) সি এম জিয়াউল হাসান।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও যন্ত্রপাতির দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বেড়েছে। ব্যয় নির্ধারণে একটি কমিটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে।’
দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও কাজ অসম্পূর্ণ : জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সূত্র জানায়, পাইপলাইনের মাধ্যমে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে জ্বালানি সরবরাহের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদিত হয়। কাজ শুরু হয় সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে। ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে পাইপলাইন নির্মাণের কথা থাকলেও তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর করা হয়। এ সময়ে ব্যয় দুই দফায় ২৪৮.৭৫ কোটি থেকে ৩৩৯.৬৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এ অবস্থায় ঠিকাদার আবারও সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির আবেদন করে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় বিস্তারিত জানতে চাইলে ঠিকাদার করোনা মহামারীসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আরও ৫৫০ কোটি টাকা দাবি করে। বিপিসি এতে অর্থায়ন করতে রাজি না হওয়ায় মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করে প্রতিবেদন দেয়। তবে, জ্বালানি বিভাগ এটি যৌক্তিক না মনে করায় গত বছরের ৩০ জুন ঠিকাদারকে চুক্তি বাতিলের নোটিস দেওয়া হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবশিষ্ট কাজের জন্য নতুন দরপত্রে এত ব্যয় বৃদ্ধি অযৌক্তিক ও অদক্ষতার পরিচয়। গাফিলতি, অবহেলা ও অস্বচ্ছতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিপূরণ আদায় করা উচিত।’
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা : দুই বছর মেয়াদের এই প্রকল্প ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন। বাকি কাজের জন্য বিপিসি নতুন দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করছে। প্রকল্পটি বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। খসড়া ডিপিপি তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানি বিভাগ এর ওপর মতামত চেয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি তালিকায় ‘দ্বিতীয় ফেজ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
প্রস্তাবিত ডিপিপিতে বলা হয়, গোদনাইল ডিপো থেকে প্রতিদিন ১৭০-১৮০ ট্যাংকলরিতে ১ হাজার ৪০০ টন জ্বালানি কুর্মিটোলা ডিপোতে পরিবহন করা হয়, যার ব্যয় ৭০ কোটি টাকা। যানজট, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধর্মঘটের কারণে জ্বালানি পরিবহনে বিঘœ ঘটে। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে জেট এ-১-এর চাহিদা দ্বিগুণ হবে, তখন সড়কপথে পরিবহন কঠিন হবে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পিতলগঞ্জ থেকে কুর্মিটোলা পর্যন্ত ১৫.২১ কিলোমিটার দীর্ঘ ৮ ইঞ্চি ব্যাসের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন নির্মিত হলে বছরে ৮.৩৬ লাখ টন জ্বালানি সরবরাহ সম্ভব হবে। এতে পরিবহন খরচ কমবে, জ্বালানি ক্ষতি বন্ধ হবে, যানজট ও পরিবেশদূষণ হ্রাস পাবে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, দুটি আনলোডিং আর্মসহ জেটি নির্মাণ, পাম্পিং ফ্যাসিলিটিসহ নতুন ডিপো, তিনটি স্টোরেজ ট্যাংক, অবশিষ্ট পাইপলাইন স্থাপন, টেস্টিং ও কমিশনিং, ক্যাথোডিক প্রোটেকশন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্ক্যাডা সিস্টেম, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, ফায়ার ফাইটিং সরঞ্জাম এবং প্রকল্প তদারকির জন্য ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগ।
