আইজিপির সংবাদ সম্মেলন

নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট শক্তি মোকাবিলাই বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:২৪ এএম

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট শক্তি মোকাবিলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি বলেন, পরাজিত ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী, তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা পুলিশের জন্য উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সক্ষমতা অর্জন করাও পুলিশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পুলিশ সদর দপ্তরের হল অব ইন্টিগ্রিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নির্বাচন সামনে রেখে চ্যালেঞ্জের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশ থানা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এক বছরের মধ্যে বাহিনীকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে আসা নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছি এবং আমাদের বিশ্বাস, আমরা তা পারব। কোনো নির্দিষ্ট শক্তির কথা আমি উল্লেখ করতে চাই না। তবে পরাজিত ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী, তাদের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’

মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার বিষয়ে এবং জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আইজিপি বাহারুল বলেন, ‘পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, আপনাদেরও থাকা উচিত নয়। মোহাম্মদপুর-আদাবরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছি এবং কিছু ক্ষেত্রে নিবর্তনমূলক আটক আদেশ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছি।’

পুলিশের সাবেক আইজিপিদের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে বলা হয়েছে যে, বর্তমান মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের দিয়ে নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধ সম্ভব নয় সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা যাই বলুন, আমরা সক্ষম। বাহিনীর ১ লাখ ৫০ হাজার সদস্যকে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নজির এর আগে ছিল না। প্রশিক্ষণে তাদের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ, ভোটিং প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কেন্দ্রের বিধিবিধান হাতে-কলমে শেখানো হবে। এ ছাড়া, প্রত্যেক সদস্যের পটভূমি আগেই যাচাই করা হবে। দায়িত্ব পালনে অক্ষম কাউকে পাওয়া গেলে তাকে বদল করা হবে।’

১৩৫০টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি এখনো : লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কাদের হাতে আছে এবং এগুলো উদ্ধার না হলে ঝুঁকি আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৫০টি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। আমরা নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। অস্ত্রগুলো কার হাতে আছে, তা জানলে সমস্যাই থাকত না। আমাদের ধারণা, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদী, পাহাড়ি গোষ্ঠী বা আরসার হাতে থাকতে পারে। এ বিষয়ে আমরা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছি।’

থানায় জমা দেওয়া ব্যক্তিগত অস্ত্র লুটের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘থানা থেকে অল্প কিছু অস্ত্র লুট হয়েছে, তবে পুলিশের অস্ত্রের সংখ্যাই বেশি। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত বৈধ অস্ত্র সরকারের কাছে জমা নেওয়া হয়েছে। যারা জমা দেননি, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।’

পূজামণ্ডপে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা : আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজায় সারা দেশে ৩১ হাজার ৬০৬টি মণ্ডপে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৯টি ছোট-বড় ঘটনা আমলে নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৫টি মামলায় ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে পুলিশের সাইবার ইউনিট কাজ করছে।’

গ্রেপ্তারের পরও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা : আইজিপি বলেন, ‘পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলা করা হয়েছে। তারপরও একটি গোষ্ঠী বিষয়টি বড় ইস্যুতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি কারা করছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলা : আইজিপি জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় ১ হাজার ৭৬০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। চার্জশিট দেওয়া ৫৫টি মামলার মধ্যে ১৮টি হত্যা মামলায় ১ হাজার ৯৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাকি ৩৭টি মামলায় ২ হাজার ১৮৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী, পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে আদালত ইতিমধ্যে ১৩৬ জনকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। আরও ২৩৬ জনের অব্যাহতির আবেদন পুলিশের বিবেচনায় রয়েছে, যাদের আমরা নিরীহ ও নির্দোষ মনে করছি।’

নির্বাচনে নাশকতার চেষ্টা ঠেকাতে তৎপর র‌্যাব: নির্বাচন বানচাল করতে সরকারবিরোধীরা ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহিদুল রহমান। তিনি বলেন, এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীতে কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

র‌্যাব ডিজি শহিদুর রহমান বলেন, পুলিশের লুট হওয়া প্রায় ১ হাজার ৩৫৭টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। তবে ইতিমধ্যে ৭০-৮০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। গত মাসেও তিনটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, বাকি অস্ত্রগুলোও উদ্ধার করতে সক্ষম হব।

এসব অস্ত্র বাইরে থাকাটা নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র বিভিন্ন শ্রেণির অপরাধের কাছে থাকতে পারে। এসব অস্ত্র যতদিন বাইরে থাকবে, তত বিষয়টি আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আমরা আশা করি জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হবে।

পাহাড়ে সাম্প্রতিক অশান্তির বিষয়ে র‌্যাব ডিজি বলেন, খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের অভিযোগ কেন্দ্র করে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। যদিও দ্রুত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তারপরও পরিস্থিতিকে বড় আকার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এর পেছনে ইন্ধন আছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। বিদেশি কোনো অপশক্তির সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে র‌্যাবের বিশেষ প্রস্তুতি চলছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার অব্যাহত আছে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে র‌্যাব সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ থাকে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আমরা নিরলস চেষ্টা চালাচ্ছি। গাজীপুরে র‌্যাব সদস্যদের আটকে রাখার ঘটনায় মামলা হয়েছে, আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে না। আমরা আশাবাদী, যেকোনো পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত