ঠাকুরগাঁওয়ে বিলুপ্তির পথে ২৭ জাতের ধান

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৫৭ এএম

উচ্চ ফলনশীল (হাইব্রিড) ধানের দাপটে টিকতে না পেরে ঠাকুরগাঁওয়ে বিলুপ্তির মুখে স্থানীয় ২৭টি আদি জাতের ধান।

এক সময় ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠ জুড়ে আবাদ হতো মাল সারা, মাগুরশাল, সাপাহার, রাজুভোগ, কালোনেনিয়া, সাদানেনিয়া, সিন্দুর কটুয়া, ধোরা ভাদুই, চেঙ্গা, কাকুয়া, পারি যা, কাশিয়া বিন্নি, কল মিতাসহ আরও নানা জাতের ধান। সময়ের আবর্তে আজ তা শুধুই স্মৃতি। কৃষকরা এখন উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষে ঝুঁকছেন, কারণ ফলন বেশি। কিন্তু এই পরিবর্তনের মূল্য দিতে হচ্ছে এক বিশাল ঐতিহ্য আর স্বাদের বিনিময়ে। আদি সেসব ধানের বীজগুলো এখন ঠাঁই পেয়েছে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সংরক্ষণাগারে, যা কালের সাক্ষী হয়ে নীরবে জানান দিচ্ছে হারানো ঐতিহ্যের কথা।

কৃষকরা বলছেন, নতুন জাতের ধান চাষ করে কাক্সিক্ষত ফলন ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে ভাতের আসল স্বাদ আর ঘ্রাণ। পুরনো জাতের ধানে যে অন্যরকম ঘ্রাণ এবং ভাতের স্বাদ ছিল, তা এখনকার ধানে অনুপস্থিত।

স্থানীয় কৃষকরা বলেন, এখনকার ধানের ভাত খেয়ে পেট ভরে, কিন্তু সেই তৃপ্তিটা আর পাই না। আগের ধানের ভাতে যে মিষ্টি ঘ্রাণ ছিল, তা মুখে লেগে থাকত। ওই ধান দিয়ে তৈরি পিঠাপুলি, পায়েস আর ভাপাপিঠার স্বাদ ছিল একেবারেই অন্যরকম, যা এখন আর মেলে না।

স্থানীয়দের জোরালো দাবি, সরকারি উদ্যোগেই যেন এই ঐতিহ্যবাহী ধানগুলো সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবিত হয়। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বে আজ বিলুপ্তির পথে ঠাকুরগাঁওয়ের এই আদি ধানগুলো।

একসময় এই ২৭ জাতের ধান বছরের দুই মৌসুমে চাষ হতো, যা ছিল আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গা মোকাবিলায় কৃষকদের প্রধান সহায়ক।

স্কুলশিক্ষক আব্দুল আলীম বলেন, এই ধানগুলো শুধু ফসল ছিল না, আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। প্রতিটি ধানের নাম, তার বিশেষত্ব, পিঠাপুলি তৈরির পদ্ধতি এগুলো ছিল আমাদের ঐতিহ্য।

স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা মানব কল্যাণ পরিষদের প্রকল্প সমন্বয়কারী রাশেদুল আলম বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো বিলুপ্ত এই ধানগুলোর বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণাগারে রেখেছি। এখন প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বৃহত্তর উদ্যোগের, যাতে এই বীজগুলো আবার মাঠে ফিরিয়ে আনা যায়।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাসিরুল আলম বলেন, ‘হাইব্রিড ধানের ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা সেদিকে ঝুঁকছেন। তবে আমরা বিলুপ্তপ্রায় জাতগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করছি এবং জাতীয় পর্যায়ে বীজ সংরক্ষণের উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার চেষ্টা করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত