দীর্ঘ সময় নিয়ে, দীর্ঘ বিতর্কের পর অবশেষে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। কিন্তু একমত হলেও, অনেক বিষয়ে একমত হয়নি দলগুলো। যেমন এই গণভোটের প্রক্রিয়া বা গণভোট কবে হবে; জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিন, নাকি আগে এসব বিষয়ের ঐকমত্য হয়নি। তার চেয়েও আরেকটি বিষয় গুরুতর। গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এমন কথাও বলা হচ্ছে যদিও রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ব্যাপারে সাধারণভাবে একমত হয়েছে, কিন্তু প্রশ্নটা তো থেকেই যাচ্ছে, সামগ্রিক বিবেচনায় এর আদৌ কি কোনো দরকার আছে? এ রকম নানামুখী আলোচনার মধ্যেই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি। সেগুলো হলো : ১. একটি আদেশ জারি করতে হবে। ২. ওই আদেশের মাধ্যমে গণভোট আয়োজন করতে হবে। ৩. গণভোটে দুটি আলাদা প্রশ্ন থাকতে হবে, ঐকমত্য বা বৃহত্তর ঐকমত্য আছে যেসব বিষয়ে, সেগুলো নিয়ে একটি, আর ভিন্ন মত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে যেসব বিষয়ে, সেগুলো নিয়ে আরেকটি। ৪. নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হবে। ৫. এই আদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণভোটে অনুমোদন সাপেক্ষে, জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধান-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ
প্রস্তাব নিয়ে ৩২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দুই পর্বে আলোচনা করে। প্রথম পর্বে ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত দলগুলোর সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে কমিশন। দ্বিতীয় পর্বে ২০টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ২ জুন থেকে ৩০টি দলকে একসঙ্গে নিয়ে আলোচনা শুরু করে কমিশন। প্রথমে কমিশন চেয়েছিল, জুলাই মাসের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করানো। কিন্তু তা করা সম্ভব হয়নি। তেমন কোনো ঐকমত্য ছাড়াই ৩১ জুলাই দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা শেষ হয়। ২০টি মৌলিক প্রস্তাবের মধ্যে অন্তত ৯টিতে ভিন্নমত দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে দুই পর্বের আলোচনার ভিত্তিতে মোট ৮৪টি প্রস্তাব (ভিন্নমতসহ) নিয়ে জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করে ঐকমত্য কমিশন; কিন্তু সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে দুই পর্বের আলোচনাতেও মতৈক্য হয়নি। পরে দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাদাভাবে অনানুষ্ঠানিক-আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে কমিশন। সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে দলগুলোর লিখিত মতামতও নেওয়া হয়। দেখা যাচ্ছে যে, প্রস্তাবিত জুলাই সনদের সব বিষয়ে সবাই একমত হননি। কিছু ইস্যুতে সব দল একমত হয়েছে, আবার কিছু ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সেই বিবেচনা থেকে সংবিধান সংশোধনীর প্রস্তাবিত বিষয়গুলো দুই ভাগে ভাগ করে গণভোট করতে আগ্রহী। কিন্তু এতে জটিলতা কাটবে না কি বাড়বে, এটা গুরুতর প্রশ্ন। ঐকমত্য কমিশন সূত্রে জানা গেছে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ৯টি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। এ কটি বিষয় নিয়ে গণভোট হলে জনগণ ভোট দেবে কীভাবে? আবার এই বিষয়গুলোর মধ্যে কেউ কিছু বিষয়ে একমত হতে পারে, আবার অনেকগুলোতে নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভোট কোথায় এবং কীভাবে দেবে? দেখা যাচ্ছে, ভিন্নমত আছে রাষ্ট্রের মূলনীতি, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বা সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক নির্বাচন এই বিষয়গুলোতে। একজন ভোটার হয়তো দুটি বিষয়ে একটি রাজনৈতিক দলের অবস্থানের সঙ্গে একমত আর বাকিগুলোর ক্ষেত্রে নন। তখন এই ভোটার কীভাবে তার মত অনুযায়ী ভোট দেবে?
বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট হয়েছে। ১৯৭৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে পঁচাত্তর-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকার বৈধতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ১৯৮৫ সালে সামরিক শাসক এরশাদ তার ক্ষমতার বৈধতা প্রমাণ করতে, গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। আর সর্বশেষ গণভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব সংসদে পাস হওয়ার পর, জনগণ তা গ্রহণ করছেন কিনা তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। এই তিন গণভোটের অভিজ্ঞতা হলো গণভোট অনুষ্ঠিত হয় একটিমাত্র প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে। ভোটার ভোট দেবেন, ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। গণভোটের মাধ্যমে বহু প্রস্তাবের মধ্যে থেকে বাছাই করে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এর আগের তিনটি গণভোট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি গণভোটেই প্রক্রিয়াটি আগেই শুরু হয়েছে। ১৯৭৭ সালের রাষ্ট্রপতির প্রতি জনগণের আস্থা নিয়ে যখন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তখন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৮৫ সালের গণভোটের সময় জেনারেল এরশাদও রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯১ সালে ‘সাংবিধানিক’ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় সংসদ কর্র্তৃক সংবিধান সংশোধন বিল (দ্বাদশ সংশোধনী) পাস হওয়ার পর এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত গণভোটে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৯৮.৮৭ শতাংশ; ‘না’ ভোট পড়ে প্রায় ১.১৩ শতাংশ। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দ্বিতীয় গণভোটে নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ এবং ৯৪.৫ শতাংশ ভোটার পক্ষে ভোট দেন। ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘সাংবিধানিক’ গণভোটে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৮৪ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে ভোট দেন। এই গণভোটের মাধ্যমেই বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তিত হয়। বাংলাদেশের অতীত তিনটি গণভোটের বিষয় বিবেচনা করলে এটা মনে হতেই পারে যে, এবারের জুলাই সনদের জন্য নির্বাচনের আগে গণভোটের প্রয়োজন নেই। সংবিধান সংশোধনের যে বিষয়গুলোতে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা বিতর্ক নেই। ফলে একমত হওয়া বিষয়ে গণভোটের প্রয়োজন কী? আবার যে ইস্যুগুলোতে বিতর্ক আছে, সেগুলোর জন্যও কি গণভোটের প্রয়োজন আছে? কারণ এই ইস্যুগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কী, তা জনগণের সামনে তুলে ধরেই তো তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে। এর ভিত্তিতেই জনগণ দলগুলোকে ভোট দেবে। এভাবে দেখলে, জাতীয় নির্বাচনও এক ধরনের গণসম্মতি অর্জনের ভোট। নির্বাচনের সময় একজন ভোটার তার রাজনৈতিক বিবেচনা অনুযায়ী দল বেছে নেন। রাষ্ট্রের মূলনীতির ক্ষেত্রে কোন দল কী চায় তা স্পষ্ট করলে দলটির ঘোষিত রাষ্ট্রের মূলনীতি যার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, তিনি সেই দলকেই ভোট দেবেন। ফলে কোনো দলের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া মানে ধরে নিতে হবে সেই দলের অবস্থানের পক্ষেই জনগণ সমর্থন জানিয়েছে। তাহলে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে জুলাই সনদের যে ইস্যুগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত আছে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে গণভোট কি প্রয়োজন হবে?
তারপরও যদি সবাই মনে করেন, গণভোট এক ধরনের গণসম্মতি এবং গণভোট সংসদে পাস হওয়া আইন বা রাজনৈতিক ঐকমত্যকে সম্মতির শক্তি জোগায় তাহলে গণভোট হতে পারে। অতীতের মতো গণভোট জাতীয় নির্বাচনের পরও হতে পারে। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার সংসদ অধিবেশনে জুলাই সনদের সব দলের একমত হওয়ার বিষয় এবং নিজ দলের নোট অব ডিসেন্টের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করে তা রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য পাঠানোর পূর্র্বে, জনগণের সম্মতির জন্য একটি গণভোট আয়োজন করতে পারেন। দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর যেহেতু জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, ফলে গণভোট হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কী এবং কেমন হওয়া উচিত এই গণভোট? নির্বাচন কমিশনের বাজেট প্রস্তাবনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খরচ হবে ২৮০০ কোটি টাকা। গণভোট করতে হলেও সব আয়োজন করতে হবে। ফলে খরচের কথা বিবেচনা করে অনেকেই প্রস্তাব করেছেন জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট করা যেতে পারে। আর সহজভাবে নির্বাচন করতে হলে জুলাই সনদের যে বিষয়গুলোতে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে। সে ক্ষেত্রে মূল বিষয় হবে, জুলাই সনদ গ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে। ভোটের ব্যালটে উল্লেখ থাকবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না। জনগণ এর ওপর মত দেবেন।
একদিকে গণভোট নিয়ে বিতর্ক আপাত সমাধানের চেষ্টা, অন্যদিকে আবার নতুন বিতর্কের জন্ম রাজনৈতিক মহলে নতুন শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, উপদেষ্টাদের প্রতি। তারা দায়িত্ব পালন করছেন না এই অভিযোগ তুলেছে আন্দোলনের নেতারা। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, তাদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি। তার ভাষায়, ‘রাজনৈতিক দলের নেতাদের এবং যারা উপদেষ্টা হয়েছেন, তাদের অনেককে বিশ্বাস করাটা আমাদের অবশ্যই ভুল হয়েছিল। আমাদের উচিত ছিল ছাত্র নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করা, সরকারে গেলে সম্মিলিতভাবে যাওয়া। নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক দলকে আমরা যে বিশ্বাসটা করেছিলাম, যে আস্থা রেখেছিলাম, সেই জায়গায় আসলে আমরা প্রতারিত হয়েছি। অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছে অথবা গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে (প্রতারণা) করেছে। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করব।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে ফেলেছে। তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথা ভাবছে। এটা আমাদের অনেক পোহাতে হচ্ছে এবং পোহাতে হবে।’ এর পরপরই আর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপদেষ্টারা কোথায় সেফ এক্সিট নেবে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘পৃথিবীতে সেফ এক্সিট নেওয়ার একটাই জায়গা, সেটা হচ্ছে মৃত্যু। এ ছাড়া কোনো সেফ এক্সিট নাই। আপনি পৃথিবী যে প্রান্তে যান, সেখানেই বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ধরবে।’ কী শুনছে মানুষ! একদিকে গণভোট অন্যদিকে নিরাপদ প্রস্থান নিয়ে সংশয়, দুটোই ভাবিয়ে তুলছে দেশের মানুষকে। তাহলে কি অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
