বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: বাঘ বাঁচলেই বাঁচবে সুন্দরবন

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে উদ্‌যাপনের এই দিনে আশার পাশাপাশি উদ্বেগের খবরও রয়েছে। সর্বশেষ সরকারি জরিপে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যাগত এই অগ্রগতির আড়ালে বাঘ এখনও চোরা শিকার, আন্তর্জাতিক পাচারচক্র, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট ও আবাসস্থল ধ্বংসের মতো একাধিক হুমকির মুখে রয়েছে।

সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক বাঘের আবাসস্থল। এই বন উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই সংরক্ষণবিদদের মতে, বাঘ রক্ষা মানেই সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।

বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রায় ২০০টি বাঘ হত্যার তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। একই সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শতাধিক বাঘের চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জব্দ করলেও এর নেপথ্যের মূল চোরাকারবারি চক্রের বড় অংশ এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বন বিভাগের কাছেও বাঘ হত্যার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই।

বাঘ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বাঘের সবচেয়ে বড় হুমকি পোচিং বা অবৈধ শিকার। আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁত, নখ ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিপুল চাহিদা থাকায় সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে শিকার চালিয়ে যাচ্ছে।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এবং সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁতসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেই চাহিদাই চোরা শিকারিদের সক্রিয় রাখছে। বনদস্যুদের একটি অংশও এখন বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িত। ফলে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঘের টিকে থাকার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

র‌্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ ও বনজীবী সূত্র জানায়, বাঘ হত্যায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ‘দাদন’ নিয়ে শিকারীরা ছদ্মবেশে বনে প্রবেশ করে। কখনো গুলি করে, কখনো ফাঁদ পেতে, আবার কখনো বিষমাখা ছাগল বা হরিণ ফেলে রেখে বাঘ হত্যা করা হয়। পরে মৃত বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁত, মাথার খুলি, চর্বি ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাঘ সংরক্ষণের আরেকটি বড় সংকট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস এবং নদীভাঙনের কারণে সুন্দরবনের অনেক এলাকা ঝুঁকিতে পড়ছে। এতে বাঘের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ও প্রজননস্থল সংকুচিত হচ্ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে বনভূমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকছে। লবণাক্ততা বাড়ায় বাঘ প্রয়োজনীয় মিঠাপানি পাচ্ছে না। পাশাপাশি খাদ্যসংকট, বন উজাড়, অপরিকল্পিত পর্যটন ও বনের ভেতর দিয়ে ভারী নৌযান চলাচলও বাঘের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, হরিণের সংখ্যা কমে গেলে খাদ্যের সন্ধানে বাঘ লোকালয়ের দিকে চলে আসে। অতীতে এ কারণে গণপিটুনিতে বাঘ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

তবে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকে লোকালয়ে ঢুকে বাঘ নিহত হওয়ার কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনের বাঘের প্রধান তিনটি হুমকি হলো- বাঘ হত্যা, বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের অবৈধ শিকার এবং বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় গত কয়েক বছরে সরকার একাধিক সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, আমাদের লোকবল অপ্রতুল। তারপরও বন বিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে বন্যপ্রাণী শিকারি ও বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। বাঘ হত্যার তথ্য দিয়ে অপরাধী শনাক্ত করতে পারলে বনাঞ্চলের ঘটনার জন্য ৫০ হাজার এবং লোকালয়ের ঘটনার জন্য ২৫ হাজার টাকা পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শুধু আইন দিয়ে হবে না, প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, বাঘ হত্যা একটি জামিন-অযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর ও সর্বনিম্ন দুই বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর না হলে পাচারচক্র পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে না।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে প্রায় ৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ চালু করা হয়। চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর আওতায় বাঘের বৈজ্ঞানিক জরিপ, আবাসস্থল উন্নয়ন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া ২১টি শাবকের অস্তিত্বও শনাক্ত হয়েছে। তবে কম বয়সী শাবকদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে তাদের মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তবে সংরক্ষণবিদদের মতে, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিলেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো, চোরা শিকার ও আন্তর্জাতিক পাচারচক্র নির্মূল, খাদ্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ উদ্যোগ জোরদার না করলে এই অর্জন টেকসই হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত