শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাবির মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৫৬ এএম

দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র নয়, এটি তরুণদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আকাক্সক্ষারও প্রতিচ্ছবি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুসারে বর্তমানে এখানে প্রায় ৪৭,১৯৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন রয়েছে সম্ভাবনা, তেমনি প্রতিনিয়ত তারা মুখোমুখি হচ্ছে নানা চ্যালেঞ্জের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে মানসিক অস্থিরতার সম্মুখীন হতে হয়। একাডেমিক চাপ, আর্থিক অসুবিধা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যাজনিত উদ্বেগ ও বিষণœতা প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। আবাসিক হলগুলোতে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে পড়াশোনার ওপর। কাক্সিক্ষত ফল অর্জনে ব্যর্থতা এবং পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে না পারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি করে হীনম্মন্যতা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, সহপাঠীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ও সামাজিক প্রতিযোগিতাও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে আত্মসমর্পণমূলক আচরণে অভ্যস্ত হয় এবং কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নেয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে সুস্থ ও শক্তিশালী করে তুলতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে মেয়েদের হলে পেশাদার মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যদিও পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও ছেলেদের হলে পর্যাপ্ত সংখ্যক মনোবিজ্ঞানীর অভাব রয়ে গেছে।

১৯৬৩ সাল থেকে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং অ্যান্ড গাইডেন্স অফিস শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে, যেখানে একদল শিক্ষানবিশ মনোবিজ্ঞানী প্রতিদিন সহায়তা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিট এবং এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের পরিচালনায় কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি সেবা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

প্রতি বছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা ও বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি, স্কুল সাইকোলজি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির আয়োজনে নিয়মিত সেবা, মনোবৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালিত হয়। অন্যান্য বিভাগেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এখনো অনেক শিক্ষার্থী এসব সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণে উদ্যোগী হয় না।

তাই প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকে শিক্ষার্থীর প্রাথমিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ঘিরে যে সামাজিক সংকোচন ও ট্যাবু রয়েছে তা দূরীকরণে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ককে আরও আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ করে গড়ে তোলার মাধ্যমেই একটি ইতিবাচক মানসিক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

লেখক : ট্রেইনি এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত