রাকসু নির্বাচন-শিক্ষার্থী ভাবনা

রাকসু নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবেন সেটিই আশা

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৫৬ এএম

দীর্ঘ ৩৫ বছরের অচলায়তন ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৬ অক্টোবর। দীর্ঘ ৬৮ বছরে মাত্র ১৪ বার হয়েছে রাকসু নির্বাচন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন প্রায় সবই সফল হয় শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসার ফলে। আর ছাত্র সংসদ সচল থাকলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠবে।

রাকসু নির্বাচন চেয়ে দীর্ঘদিন আমাদের অগ্রজরা লড়েছেন, কিন্তু ফল আসেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের রূপ নেয়, তখনই রাকসু নির্বাচনের বাসনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবলভাবে দেখা দেয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর শিক্ষার্থীরা যে বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তা অবসানের দাবি জোড়ালো হয়। শত বাধা পেরিয়ে অবশেষে হচ্ছে রাকসু।

রাকসু নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের মধ্যে আমেজটা একটু বেশিই। কারণ দীর্ঘ একটা লড়াইয়ের ফল পেতে যাচ্ছি আমরা। কথায় আছে না, সংগ্রাম যত কঠিন, জয় তত মধুর। আমরা কেবল নির্বাচন হচ্ছে বলেই আনন্দিত তেমনটাও না। কারণ আমাদের দীর্ঘ লড়াইটা নিছক রাকসু নির্বাচন হওয়া, না হওয়া নিয়ে নয়। আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে সচেতন; খাদ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আবাসন, মানসম্মত লেখাপড়ার পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চা এবং একজন দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ চাই আমরা। কিন্তু আমরা সে অধিকার থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হই, নীতিনির্ধারণে আমাদের অংশগ্রহণ না থাকায়।

সে জায়গা থেকে আমরা আশাবাদী, দীর্ঘ ৩৫ বছর পরে যে নির্বাচনটা হতে যাচ্ছে, তার মাধ্যমে যেসব প্রতিনিধি আসবেন, তারা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবেন। প্রতিনিধিরা যেমন তার নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকবেন, তেমনি বাকি শিক্ষার্থীদের অধিকার বিষয়েও সচেতন থাকবেন।

আমরা চাই রাকসু প্রতিনিধি, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি। কারণ রাকসু কোনো দলের ছাত্র সংগঠন না, এটা শিক্ষার্থীদের সংগঠন। সুতরাং রাকসুর প্রতিনিধিদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, আপনারা আমাদের প্রতিনিধি হয়ে থাকবেন।

আপনারা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করুন, এটুকুই আমাদের চাওয়া। আমরা হাত পেতে কোনো সংগঠনের দান-খয়রাত পেতে মোটেও রাজি না। আমরা আমাদের অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। আমার পেছনে বছরে যে ২ লাখ ১০ হাজার টাকার বেশি ভর্তুকি আসে সেখানে একজন রিকশাচালক,কৃষক, মজুরের ঘাম লেগে আছে, সুতরাং সে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সহায়তা করবেন বলে প্রত্যাশা রাখি। 

মনে করি একটি আদর্শ ছাত্র সংসদ শুধু ভোট ও নেতৃত্বের বিষয় নয়; বরং এটি ছাত্রদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা, সুশাসন ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। সেদিক থেকে ছাত্র সংসদের প্রধান কাজ হলো, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করা। কখনো কখনো শিক্ষকদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে শিক্ষার্থীদের হয়ে, কখনো বা নিজেই উদ্যোগী হবেন শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়ে। যেমন ছাত্র সংসদ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের আয়োজন করে। আমি চাই, রাকসু নেতৃত্ব বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিতর্ক সভা, সাহিত্য অনুষ্ঠান, বিজ্ঞানমেলা প্রভৃতি আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে কাজ করবে, ফলে শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ঘটবে। সব মিলিয়ে তারা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করবেন। এসবের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের বিকাশও ঘটবে। সিদ্ধান্ত নেওয়া, সংগঠন পরিচালনা করা এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করবে। এটাকে তাই আমি জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির প্রস্তুতি পর্ব বলেও মনে করি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ছাত্র সংসদ কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়; বরং এটি ছাত্রসমাজের স্বার্থরক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম।

আমরা ছাত্র সংসদে এমন প্রতিনিধি চাই, যারা নিজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের প্রতি দায়বোধ করবেন। তারা ‘নেতা’ হবেন না, হবেন আমাদের সহযোদ্ধা। তারা আমাদের সমস্যাগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরবেন। তাদের সামনে রেখে সবাই মিলেই আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ক্যাম্পাস গড়ে তুলব।

এখনো পর্যন্ত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাইবোনদের জন্য শৌচাগারের ব্যবস্থাটুকু নেই। এমন অনেক কিছুই করার আছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক সমস্যাও প্রকট। এ অঞ্চলে টিউশন কিংবা খ-কালীন কাজ নেই বললেই চলে। তাই আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করতে হবে। আমাদের হলের খাবারের মানও খুবই বাজে। অন্য কোনো বিলাসী খাতে ব্যয় কমিয়ে খাবারের মানটা কীভাবে বাড়ানো যায়, কীভাবে হলের পরিবেশ বাসযোগ্য করে তোলা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। তা ছাড়া একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়ন সাধন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থা ও সেশনজট দূরীকরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেলবন্ধনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে রাকসু নেতৃত্ব সেটাই আশা করি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতার বিকাশ এবং ক্যাম্পাসকে একটি নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও মুক্তচিন্তার পরিবেশে নিশ্চিত করার জন্য কাজ করবে আমাদের প্রতিনিধিরা, সেটাই আশা।

লেখক : শিক্ষাথী, দ্বিতীয় বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত