জুলাই জাতীয় সনদন্ড২০২৫-এ স্বাক্ষর করবে না বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ মার্ক্সবাদী, বাংলাদেশ জাসদ ও গণফোরাম। সনদে থাকা সূচনা বক্তব্য, চার মূলনীতি ও অঙ্গীকারনামাসহ একাধিক সংস্কারে আপত্তি তুলে ধরে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করবেন না বলে জানিয়েছেন দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তবে নির্বাচনের স্বার্থে সনদ স্বাক্ষরে ‘সম্মত’ হয়েছে বিএনপি। আর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো দ্বিধায় রয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), গণসংহতি আন্দোলন, জেএসডি (রব), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এবি পার্টিসহ সংলাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
সনদে স্বাক্ষর না করা প্রসঙ্গে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আপত্তিগুলো শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করা হলে সনদে স্বাক্ষর আমরা করতে পারব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকে (গতকাল) বৈঠক করা হলেও আমাদের বামপন্থি দলগুলোকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা অবস্থান পরিষ্কার করে বক্তব্য দেব এটি জেনেই বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বাম দলের নেতাদের।’
গতকাল সকাল থেকে একাধিক কারণ দেখিয়ে সনদে স্বাক্ষর করবে না বলে জানিয়েছিল জামায়াত ও এনসিপি। গতকাল সন্ধ্যার বৈঠকের আগে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জানার পরেই স্বাক্ষরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’ কমিশন তো চূড়ান্ত সনদের সঙ্গে বাস্তবায়নের সুপারিশ দেয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জানার পরেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব। তার আগে নয়।’
জুলাই সনদ পাঠানোর পর মঙ্গলবার রাতে এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন বলে জানা গেছে। সেখানে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাস্তবায়ন পদ্ধতি মীমাংসা না করলে জুলাই সনদ নব্বইয়ের দশকের তিন জোটের রূপরেখার মতো ব্যর্থ হবে। ‘সংবিধান আদেশ’ জারির মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে আনা না হলে এনসিপি সনদে সই করবে না বলে ওই বৈঠকে জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনসিপি বলছে, তারা মনে করে এর আগে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের সময় ছাড় দিয়েছিল। এবার আর ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা সংস্কার; বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে নতুন করে পুরো আলোচনা শুরু করার পক্ষে। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, ‘জুলাই সনদে বাস্তবায়ন পদ্ধতি উল্লেখ নেই। কমিশনের কাছে আমরা বলেছি, সেটা না থাকলে কীভাবে স্বাক্ষর করব? কী নিশ্চয়তা আছে ওই পদ্ধতিতে এটা বাস্তবায়ন হবে। স্বাক্ষরের বিষয়ে দলীয় ফোরামে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেব।’
অবশ্য দল দুটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, জামায়াত সনদে স্বাক্ষর করতে পারে। এনসিপিও করবে না জানালেও শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরে রাজি হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানান, গণতন্ত্র মঞ্চে শরিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণতন্ত্র মঞ্চে শরিক দলগুলোর হলো জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও ভাসানী পরিষদ।
সংলাপে অংশ নেওয়া একাধিক দলের নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হোক চায় না বলে স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে। গতকাল সন্ধ্যার বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সনদে স্বাক্ষর করতে আপত্তি নেই বিএনপির।
এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সামনে রেখে বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একটি বৈঠক হয়।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর নিয়ে দলগুলোর নেতিবাচক বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে। তারপরই জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। তবে সেখানে জরুরি আলাপ যেমন হয়নি, স্বাক্ষর নিয়ে মতবিরোধও দেখা যায়নি। অবশ্য সকাল থেকে সংকটের যে তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাকে ‘বিভ্রান্তি’ আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ। তিনি ‘আনন্দঘন পরিবেশে’-এ দলিল স্বাক্ষরের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বৈঠকে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি জাতীয় সনদ যে প্রক্রিয়ার মধ্যে আপনারা অংশগ্রহণ করেছেন এবং বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে আপনারা যে জায়গায় উপনীত হয়েছেন, এরই অংশ হিসেবে জাতীয় সনদে আমরা স্বাক্ষর করতে পারব। এটাই আমরা আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতির দিকগুলো সম্পূর্ণরূপে শেষ করার চেষ্টা করছি। এ সনদ স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের জন্য আরও একটু সময় নেওয়ার থেকে দ্রুততার দিকে যাওয়ার আমরা চেষ্টা করেছি। আমাদের দিক থেকে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আপনাদের প্রত্যেককে জানানো হয়েছিল এবং প্রত্যেকটি দল থেকে জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারীদের নাম বেশ কিছুদিন আগেই দিয়েছেন।’
সেজন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ অনুষ্ঠানে আমরা চাই জাতীয় নেতারা ছাড়াও যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যুক্ত সেসব অতিথি উপস্থিত থাকুন।’
সেই বিবেচনা থেকে দলগুলোর কাছে অতিথিদের তালিকা চাওয়ার কথাও তুলে ধরেন কমিশনের সহসভাপতি। তিনি বলেন, এ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র বৃহস্পতিবার থেকে পাঠানো হবে। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বল্প সময়ে যেন সব দলের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হবে।
আলী রীয়াজ বলেন, ‘আজ কিছু বিভ্রান্তি বিভিন্ন দিক থেকে প্রচারিত হয়েছে। আমাকে অনেক রাজনৈতিক নেতা এবং সাংবাদিক ফোন দিয়েছেন। আমি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষে সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমাদের দিক থেকে প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি আপনাদের দিক থেকে যে সহযোগিতা অব্যাহত আছে, তাতে আমরা আশাবাদী যে, একটি আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে আমরা এ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটা সম্পূর্ণ করব।’
গতকাল সন্ধ্যায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ‘জরুরি’ বৈঠকের স্বাগত বক্তব্যে আশাবাদের কথা জানান আলী রীয়াজ। সে বৈঠকে কমিশনের সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন। তিনি ইতালি সফর শেষে গতকাল সকালেই ঢাকায় এসে পৌঁছান। এরপর বিকেলে প্রথমে কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে করেন ‘জরুরি বৈঠক’।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনারা সবাই মিলে জাতীয় সনদ তৈরি করেছেন। সরকারের দায়িত্ব হলো উৎসবমুখর নির্বাচন করে দেওয়া।’
বিকেলের বৈঠকে কমিশনের পক্ষ থেকে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কমিশন সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, সফর রাজ হোসেন, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
পরে রাজনৈতিক দলের বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, ১২-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ ৩১টি দল ও জোটের নেতারা বৈঠকে অংশ নেন।
গত মঙ্গলবার বহুল আকাক্সিক্ষত ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’-এর চূড়ান্ত অনুলিপি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে সনদে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে কোনো সুপারিশ নেই। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ও দলগুলোর কাছে এ-সংক্রান্ত সুপারিশ দেবে কমিশন।
১৭টি বিষয়ে ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বাকি ৬৭টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ কেউ বিরোধিতা করেছে; দিয়েছে নোট অব ডিসেন্ট।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে ৮৪ দফা, তার মধ্যে ৪৭টি বিষয়কে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ এবং বাকি ৩৭টি বিষয়কে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ঐকমত্য কমিশন।
জুলাই সনদের পটভূমি ব্যাখ্যা করে সংস্কারযজ্ঞ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম তুলে ধরার পর সংস্কারের ৮৪ দফা তুলে ধরা হয়েছে ৪০ পৃষ্ঠার সনদে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কী অঙ্গীকার করছে, তা উল্লেখ করার পর রাখা হয়েছে স্বাক্ষরের জায়গা।