বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের রাজা হিসেবে বিচরণ করছে বাঘ, যা পরিচিত রয়েল বেঙ্গল টাইগার হিসেবে। এই বাঘ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, সুন্দরবনের শক্তি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতীক। কিন্তু সময় বদলে যাচ্ছে। বনের এই রাজা এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যার বিরুদ্ধে বাঘের নখ-দাঁত, গতি কিংবা শক্তি কোনো কাজে আসে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বাড়ছে লবণাক্ততা। হচ্ছে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়। খাদ্য শৃঙ্খলেরও পরিবর্তন ঘটছে। আছে আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের তৎপরতা। এসব কারণে বহুমুখী সংকটে পড়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তবে আশার কথা বাঘ রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। যার ফলে দিনে দিনে বাঘের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।
আজ বুধবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ২০১০ সাল থেকে এ দিবস পালন করে আসছে। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আন্তর্জাতিক টাইগার সামিটে যখন বাঘ দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন বিশ্বে বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছিল ৩২০০টিতে। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশের সম্মিলিত উদ্যোগে বাঘ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশগুলো বাঘের সংখ্যা বাড়াতে সফল হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এবং ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ক্যামেরা ট্র্যাপিং এবং খাল সার্ভের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ শুরু হয়। বাঘ জরিপের জন্য সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে চারটি প্রশাসনিক রেঞ্জ, ৫৫টি কম্পার্টমেন্ট এবং সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের জন্য সুন্দরবনকে ৬৬৮টি গ্রিডে ভাগ করে ৬৬৫টি ক্যামেরা বসানো হয়। ৩১৮ দিন ধরে ছবি ধারণের পর প্রায় ১০ লাখের মতো ছবি সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্য থেকে বাঘের ছবি পাওয়া যায় ৭ হাজার ২৯৭টি। সব ছবি ও বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগ বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১২৫টি। এর আগের গণনায় বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি।
সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত চলে। প্রকল্পের আওতায় সনাতন যুগ পেরিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার গণনায় এখন যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাপিং প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে নিখুঁত ডেটা অ্যানালাইসিসের সাহায্যে বনের বাঘের প্রকৃত ঘনত্ব ও সংখ্যা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমান জানান, বাঘ গণনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় দুই মিটার দূরত্বে উঁচু স্থানে যেখান দিয়ে বাঘের ডোরাকাটা দাগগুলো চিহ্নিত করা যায়, সেখানে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আমরা নিজস্ব অ্যাপসের মাধ্যমে ডোরাকাটা দাগ বাছাই করেছি। এভাবে বাঘের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় আমরা দুটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছি। একটি হচ্ছে বাঘের সংখ্যা নিরূপণ, অন্যটি সুন্দরবনের বাঘ কোর এলাকা যেখানে সমুদ্রের পাশে প্রতিনিয়ত ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বড় জোয়ারের পানিতে বন্যপ্রাণী টিকে থাকা মুশকিল হয় সেখানে উঁচু টিলা নির্মাণ করেছি।
তিনি আরও জানান, গহিন জঙ্গলের মধ্যে পুকুর তৈরি করা হয়েছে, যাতে বণ্যপ্রাণী মিষ্টি পানি পান করতে পারে। বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে পশ্চিম বন বিভাগ এবং পূর্ব বন বিভাগের সীমানা এলাকায় ৭৪ কিলোমিটার বেঞ্চিং করা হয়েছে। কোনো বন্যপ্রাণী যাতে গ্রামে প্রবেশ করতে না পারে, সে লক্ষ্যেও কাজ চলছে।
তিনি জানান, ২০১৮ সালের পর থেকে সুন্দরবন এখন আর কোনো বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করেনি। এখন আর পিটিয়ে বাঘ হত্যার খবর পাওয়া যায় না। এ ছাড়া বণ্যপ্রাণী হত্যা রোধে সারা সুন্দরবনে ২৫টি ক্রাইম হটস্পট বাছাই করে সেখানে স্মার্ট প্যাট্রল টিম জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে। বাঘকে যদি রক্ষা করা যায়, তাহলে পুরো সুন্দরবন রক্ষা পাবে। সম্প্রতি চোরাশিকার রোধ ও নিয়মিত টহলের কারণে বাঘের পাশাপাশি হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, একসময় বাঘের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থাগুলোও তখন বাংলাদেশকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছিল। এখন বাঘের সংখ্যা বাড়ছে।
শুধু বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সাফল্যের একমাত্র সূচক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ একটি বাঘের অস্তিত্ব নির্ভর করে একটি সুস্থ বন, পর্যাপ্ত শিকার, নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র, স্বাভাবিক নদীপ্রবাহ এবং স্থিতিশীল জলবায়ুর ওপর। এ উপাদানগুলোর যেকোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব বাঘের ওপরই পড়ে। আজ কতটি বাঘ আছে সেটি বড় নয়, আগামী ২০-৩০ বছর পর সুন্দরবনের পরিবেশ বাঘের জন্য কতটা উপযোগী থাকবে, সেটির ভাবনার বিষয়।
পরিবেশবিদ স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এর প্রায় ৬২ শতাংশ বাংলাদেশের অংশে এবং বাকি অংশ ভারতে বিদ্যমান। এই বন শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল নয় শত শত প্রজাতির মাছ, পাখি, সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং উদ্ভিদের আশ্রয়স্থল। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত কমানো, জলোচ্ছ্বাসের শক্তি শোষণ এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ধারণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই বন এখন নিজেই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার।
অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, সুন্দরবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সুন্দরী গাছ। কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পরিবেশগত চাপের মুখে রয়েছে এই প্রজাতি। সুন্দরী গাছ কমে গেলে শুধু একটি গাছের প্রজাতি হারাবে না, বদলে যাবে পুরো বনভূমির কাঠামো। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ওপর। কারণ বাঘের শিকার ধরার জন্য প্রয়োজন ঘন বন ও প্রাকৃতিক আড়াল। একই সঙ্গে নিরাপদ প্রজননের জন্যও নিরিবিলি বনাঞ্চল দরকার। বন পাতলা হয়ে গেলে শিকার ধরা কঠিন হবে, বাঘের বিচরণক্ষেত্রও সংকুচিত হবে এবং মানুষ-বাঘ সংঘাত বাড়তে পারে।
বাঘের সুরক্ষা দিতে বনে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বন বিভাগ। সুন্দরবন দুটি ভাগে বিভক্ত। তার একটি পূর্ব, অন্যটি পশ্চিম বিভাগ। কিন্তু এরপরও বাঘের জীবন ও চলাচল নিরাপদ নয়। সবচেয়ে বড় হুমকি শিকার। বন বিভাগের কর্মকর্তা, গবেষক এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সুন্দরবনকে ঘিরে বহু বছর ধরে একটি আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয়। এ নেটওয়ার্ক সাধারণত কয়েকটি ধাপে কাজ করে। প্রথমে স্থানীয় শিকারি বা ফাঁদ পাতা দল বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করে। অনেক ক্ষেত্রে শিকারিরা বাঘকে লক্ষ্য করে ফাঁদ পাতেন না। তারা হরিণ ধরার জন্য তারের ফাঁদ বসান। কিন্তু সেই ফাঁদেই আটকা পড়ে। এরপর মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে তা সীমান্তঘেঁষা পাচারকারীদের হাতে পৌঁছায়। শেষ ধাপে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এসব প্রাণীর অঙ্গ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ ন্যাচার অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন সেন্টারের সদস্য-সচিব আব্দুল্লাহ বনি বলেন, বাঘ সুন্দরবনের সৌন্দর্য। বাঘ আছে বলেই এখনো বন অনেকটা সুরক্ষিত। বিভিন্ন সময়ে চোরাশিকারিদের হাতে বনের অসংখ্য বাঘ মারা পড়েছে। চোরাশিকারিরা অতি লাভের আশায় সুন্দরবনের এই বন্যপ্রাণী হত্যা করে চামড়াসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করে থাকে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ খুলনা বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, ২০০১ থেকে ২৩ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে মোট ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব বিভাগে ৩০ এবং পশ্চিমে ৩২টি বাঘের মৃত্যু হয়। সুন্দরবনে গত আড়াই দশকে দুষ্কৃতকারীদের হাতে ২৬ এবং গণপিটুনীতে ১৪টি বাঘের মৃত্যু হয়। আর বাকি ২১টি বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। আর একটি বাঘের মৃত্যু হয় ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে। সর্বশেষ গত ২০২৩ সালে একটি বাঘের মৃত্যু হয়। এরপর কিন্তু নতুন করে আর কোনো বাঘের মৃত্যু হয়নি। বাঘ রক্ষায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। গত দুই বছরে কিন্তু কোনো বাঘের প্রাণহানি ঘটেনি।
