নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের ‘উৎসব’

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৩১ এএম

যতদূর চোখ যায় শুধু নৌকা আর নৌকা। নৌকাগুলো থেকে কেউ নদীতে জাল ফেলছেন। কেউ জাল টেনে উঠাচ্ছেন। কেউ আবার মাছ ধরা শেষে নদীর তীরে নৌকা নোঙর করছেন। রাজবাড়ীর পদ্মায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এভাবেই অবাধে উৎসবের আমেজে চলছে ইলিশ শিকার। মৎস্য কর্মকর্তাদের দাবি, ইলিশ শিকার বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে পুরোপুরি সফল হওয়া যাচ্ছে না।

পদ্মা তীরবর্তী মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞার শুরুর দিকে নদীতে মাছ ধরার নৌকা কম ছিল। কিন্তু দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌকা বেড়েছে। সারা বছর যেসব জেলেরা ইলিশসহ অন্যান্য মাছ শিকার করে তাদের কিছু অংশ ছাড়াও মৌসুমি জেলেরা এই মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত। মৌসুমি জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ শিকারের জন্য নতুন নতুন নৌকা তৈরি করেন। অনেকেই বিভিন্ন পেশা থেকে এসে এই মাছ শিকারের জন্য নদীতে নামেন। অল্প দিনে বেশি টাকা আয়ের জন্য কেউ আসেন, আবার কেউ শখের বসে নদীতে যান। যারা নদীতে মাছ শিকারে যান তাদের কিছু লোক ওপরেও থাকেন। যখন প্রশাসনের লোক অথবা নৌ-পুলিশ নদীতে নামে, তখন তাদের কাছে খবর চলে যায়। দ্রুতই তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।

কয়েকজন মাছ শিকারি বলেন, এখন নদীতে মাছ কম ধরা পড়ছে। বেশি মাছই ছোট আকারের। বড় আকারের মাছ তুলনামূলকভাবে কম। ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা কেজি পর্যন্ত এই মাছ বিক্রি করা হয়। মাছ কেনার জন্য নদীর পাড়ে পাইকাররা অপেক্ষা করেন। তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আগে থেকেই যোগাযোগ করা হয়। পাইকাররা এসব মাছ কিনে নিয়ে গ্রামে ফেরি করে এবং পূর্ব নির্ধারিত ক্রেতার কাছে এসব মাছ বিক্রি করেন।

রাজবাড়ীর সদর উপজেলার অন্তারমোড়, উড়াকান্দা, গোদারবাজার, মহাদেবপুর, কালীতলা, ধাওয়াপাড়া ঘাট, কালুখালীর মহেন্দ্রপুর নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় শুধু নৌকা আর নৌকা। একেকটি নৌকায় তিন থেকে পাঁচজন জেলে রয়েছেন।

হবিবর নামে এক জেলে বলেন, ‘আমরা নদীভাঙন এলাকার মানুষ। বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছি। রাত পোহালেই কিস্তি দিতে হয়। মাছ না ধরলে আমরা খাব কী? এ ছাড়া অভিযান শেষ হলে নদীতে আর ইলিশ পাওয়া যাবে না। তাই ইলিশ ধরি। অনেক সময় ভয়েও থাকি। তারপরও জীবনের তাগিদেই নদীতে যাই।’

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ১৬ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত ১০৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ৩৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১০০ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারদ- দেওয়া হয়েছে। ১১ লাখ মিটার জাল জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে। ৩৯৭ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলেদের কাছ থেকে ৭৩ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা ও নিলামে নৌকা বিক্রি করে ৯৭ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুব উল হক বলেন, ‘৪ অক্টোবর থেকে নদীতে ইলিশসহ সব ধরণের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নদীতে মাছ শিকার বন্ধে মৎস্য অফিস, জেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সম্পূর্ণভাবে ইলিশ শিকার বন্ধ করা যাবে না।’

এদিকে পটুয়াখালীর বাউফলে তেঁতুলিয়া নদীতেও নিষেধাজ্ঞা ভেঙে চলছে ইলিশ শিকার। এখানে রাতে জেলেরা সবচেয়ে বেশি সরব থাকে। তাই দিন শেষে রাত হলেই তেঁতুলিয়া নদী যেন অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক দিনে অভিযান চালিয়ে ৬৮ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে মৎস্য কর্মকর্তাদের তৎপরতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৫ জন। নৌ-পুলিশ মাত্র তিন জেলেকে আটক করে নিয়মিত মামলা করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে নৌ-পুলিশ নদী অরক্ষিত করে ফেলেছে। এর প্রভাব সারা বছর নদীতে লেগে থাকে।

জেলে জাকির পালোয়ান বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের মধ্যে মাত্র ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এই চাল দিয়ে ৭-৮ জনের সংসারে কীভাবে চলে? তাই বাধ্য হয়ে নদীতে নামতে হচ্ছে।’

মৎস্য কর্মকর্তা এমএম পারভেজ বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৬৮ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ৩০ জনকে জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪০ হাজার মিটার জাল উদ্ধার করে তা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নদী বাঁচাতে আমরা তৎপর রয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত