ট্যারিফ প্রত্যাহারে আলটিমেটাম বন্দর বন্ধের হুমকি

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০১:১৬ পিএম

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফ নিয়ে ৭ দিনের মধ্যে সমাধান না হলে বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর অংশ হিসেবে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চালকদের চলমান ধর্মঘটের পাশাপাশি আজ রবিবার থেকে কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করবে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আগামী ৭ দিনের মধ্যে ট্যারিফ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বর্ধিত ট্যারিফ আদায় স্থগিত রাখতে হবে।

গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম মহানগরীর নেভি কনভেনশন সেন্টারে চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরাম আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে ব্যবসায়ীরা এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই।

গতকাল প্রতিবাদ সমাবেশে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমরা বর্ধিত ট্যারিফ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের অবস্থান তুলে ধরেছিলাম। প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের দাবি লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। তার পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই সনদের কারণে বন্দরের এই ইস্যুতে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।

গত শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ায় আমরা সরকারকে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দিচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফের সমাধান করতে হবে। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বর্ধিত ট্যারিফ আদায় স্থগিত রাখতে হবে। অন্যথায়, ৭ দিন পর বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ তিনি জানান, আজ রবিবার থেকে কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিদিন চার ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করবে। বর্ধিত গেট পাস ফি’র কারণে ইতিমধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চালকরা ধর্মঘট শুরু করেছেন।

আমীর হুমায়ুন বলেন, ‘আমরা ট্যারিফ বৃদ্ধির বিপক্ষে নই। তবে তা বাড়াতে হলে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কোন খাতে বৃদ্ধি প্রয়োজন, তা নিয়ে আলোচনা করলে আমরাও সমর্থন দিতে পারি। আমরা এই বন্দর ব্যবহার করি, তাই আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া ট্যারিফ বাড়ানো যাবে না।’

চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘আগে ব্যবসায়ীদের কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এই সুযোগে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ ট্যারিফ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা মগের মুল্লুকের মানুষ নই যে, আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে আর আমরা মেনে নেব। পণ্য নিতে বন্দরে গাড়ি প্রবেশ করবে, সেই গাড়ির চালকের ফি কেন লাগবে? আগে গেট পাস ফি ছিল ৫৭ টাকা, এখন তা বাড়িয়ে ২৩০ টাকা করা হয়েছে। এ ধরনের অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া যায় না। ট্যারিফ বৃদ্ধি করে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের পরিকল্পনা হতে পারে না। আমরা ট্যারিফ বৃদ্ধির পক্ষে, তবে তা হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে।’

তিনি সরকারের আমলাদের উদ্দেশে বলেন, ‘যদি কোনো কারণে বন্দর অচল হয়, তবে এর দায় সরকারের। আমাদের ওপর দায় চাপানো যাবে না।’

চিটাগাং কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এই বন্দর ধ্বংসের চক্রান্ত চলছে। বর্ধিত ট্যারিফ প্রত্যাহার করতে হবে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য দুঃসংবাদ।’

বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও এশিয়ান গ্রুপের প্রধান এম এ ছালাম বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু এখন ব্যবসা বন্ধ করে প্রতিবাদে নামতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ট্যারিফ বাড়াতে পারে না। নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। বন্দর প্রতিবছর দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা লাভ করছে, তাহলে ট্যারিফ বাড়ানোর প্রয়োজন কী?’

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আজ অশনি সংকেত। বন্দর কর্র্তৃপক্ষ দাবি করছে ট্যারিফ ৪১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তা ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে আমদানিকারক ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের বক্তব্য : ব্যবসায়ীদের আল্টিমেটাম প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘বর্ধিত ট্যারিফ মন্ত্রণালয়ের আদেশে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এটি স্থগিত বা বাতিলের এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের, বন্দর কর্র্তৃপক্ষের কিছু করার নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮৬ সালে ট্যারিফ কার্যকরের সময় বন্দর বছরে ৩৯,০৫৬ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করত। এখন তা ৩২ লাখের বেশি। সরঞ্জাম, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বন্দরের খরচ বহুগুণ বেড়েছে। বর্ধিত ট্যারিফের আয় সেবার মানোন্নয়নে ব্যবহৃত হবে, যা ব্যবসায়ীদেরই সুবিধা দেবে। আগে জাহাজকে ৫-৬ দিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন তা লাগে না। আমাদের হিসাবে, ট্যারিফ বৃদ্ধিতে প্রতিকেজিতে মাত্র ১২ পয়সা বাড়বে, তাই ভোক্তা পর্যায়ে এর প্রভাব পড়বে না।’

ধর্মঘট চলছে : গত বুধবার থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রাইম মুভার, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি প্রবেশ করছে না। এতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও আমদানি পণ্য অফ-ডকে পৌঁছানোর কাজে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর প্রাইম মুভার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আগে গেট পাস ফি ছিল ৫৭ টাকা, গত অক্টোবর থেকে তা ২৩০ টাকা করা হয়েছে। আমাদের প্রায় ১৫ হাজার গাড়ি ও ১০ হাজার চালক রয়েছেন। এত টাকা দিয়ে বন্দরে ঢোকা সম্ভব নয়।’

বন্দর ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি হুমায়ুন কবির সোহেল বলেন, ‘আমাদের ১২ হাজার ট্রাক বন্দরে যাতায়াত করে। বন্দরের উন্নতিতে আমাদের ভূমিকা রয়েছে। তাহলে বর্ধিত ট্যারিফ কেন? বন্দর কি লোকসানে আছে?’

ধর্মঘটের কারণে বন্দর থেকে পণ্য বের হচ্ছে না, তবে রপ্তানি পণ্য জরুরি ভিত্তিতে পৌঁছানো হচ্ছে।

এদিকে গতকাল প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তৃতা করেন বিজিএমইএর পরিচালক এম মহিউদ্দিন, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. পারভেজ আকতার, টায়ার টিউব ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের মঈনুদ্দিন আহমেদ মিন্টু, ডব্লিউটিসি সভাপতি মোহাম্মদ শফি প্রমুখ।

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর করেছে। এর প্রতিবাদে ১২ অক্টোবর ব্যবসায়ী নেতারা তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। এবার তারা সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ হ্যান্ডল করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর ৩২.৯৬ লাখ কনটেইনার ও ১৩ কোটি মেট্রিক টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডল করেছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত