রাতে জবাই করা গাভি সকালে ‘ষাঁড়’

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:০১ এএম

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্স রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রোগাক্রান্ত গরুর মাংস খেয়ে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এই আতঙ্কের মধ্যেই গাজীপুরের শ্রীপুরে কিছু অসাধু মাংস বিক্রেতা সুযোগ নিচ্ছেন। রোগা, অসুস্থ গাভি জবাই করে তা ষাঁড়ের মাংস হিসেবে বিক্রি করছেন তারা, যা ক্রেতাদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছেন। লোকবলের ঘাটতি ও তদারকির অভাবে এই অপকর্ম অব্যাহত রয়েছে।

শ্রীপুরের বিভিন্ন হাটবাজারে রোগা, হাড্ডিসার গাভি জবাইয়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। রাতে জবাই করা এসব গাভির মাংস সকালে তরতাজা ষাঁড়ের মাংস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। সরেজমিনে শ্রীপুর পৌর মাংসপট্টিতে গিয়ে দেখা গেছে, ছয়টি গরুর মধ্যে পাঁচটি গাভি, যার মধ্যে তিনটি অত্যন্ত রোগা ও দুর্বল। একটি গরুর গায়ে ঘা এবং আরেকটির শরীর ফ্যাকাশে ও পেকে যাওয়া অবস্থায় ছিল। এসব গরু শেষ রাতে জবাই করে সকালে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা, কেওয়া, গোসিংগা, শৈলাট, বাঁশবাড়ি, নিজমাওনা, কারণ, সলিংমোড়, রাজাবাড়ী, তেলিহাটী, জৈনা, কাওরাইদ ও গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী বাজারে নিয়মিত গরু জবাই হচ্ছে। এসব বাজারে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বসবাসের কারণে মাংসের চাহিদা সারা মাসই থাকে, বিশেষ করে মাসের ১০ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার রাতে জবাই বেশি হয়, কারণ শুক্রবার ছুটির দিনে মাংসের চাহিদা থাকে বেশি।

ক্রেতা আজিজুল বলেন, ‘মাসে এক-দুবার মাংস কিনি। কিন্তু বাজারে গেলে বোঝা যায় না কোনটা গাভির মাংস, কোনটা ষাঁড়ের। কসাইরা একটি ষাঁড় জবাই করে তার পুরুষাঙ্গ ঝুলিয়ে সব মাংসকে ষাঁড়ের বলে চালায়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুদি দোকানি বলেন, ‘রাতে গাভি জবাই হলেও সকালে সব ষাঁড়ের মাংস হয়ে যায়। তদারকির অভাবে ক্রেতারা ঠকছেন।’

জবাইয়ের আগে পশু হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট (এনওসি) নেওয়ার বিধান থাকলেও, তা মানা হয় না। বেশিরভাগ কসাইয়ের নিবন্ধন নেই, ফলে যাচ্ছেতাই জবাই চলছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও পৌরসভা লোকবলের ঘাটতির অজুহাতে তদারকি করতে পারছে না। পশু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করে, তারা মাঝেমধ্যে হাটবাজারে নজরদারি ও অভিযান চালায় এবং কসাইদের প্রশিক্ষণ দেয়। তবে তারা স্বীকার করে, লোকবল সংকটে নিয়মিত তদারকি সম্ভব হয় না।

শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফ হোসেন বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি এখানে নেই। তবে রোগা গরু জবাইয়ের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।’

গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নারগিস খানম বলেন, ‘লোকবল সংকটে সব সময় তদারকি সম্ভব হয় না। তবে অসুস্থ পশু জবাইয়ের খবর পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শ্রীপুর পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মো. জাকির হোসেন জানান, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্ব পশু হাসপাতালের, পৌরসভা শুধু জবাইয়ের স্থান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেখে।

শ্রীপুর বাজারের কসাই মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, ‘আমরা সুস্থ গরু কিনে জবাই করি। গরু দেখলেই বুঝতে পারি সেটি সুস্থ কি না।’ তবে প্রাণী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন নেই বলে স্বীকার করেন তিনি।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার সজীব আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কের মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতারণা ও তদারকির অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ ও কসাইদের নিবন্ধন নিশ্চিত করা না হলে এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়। সুস্থ ও নিরাপদ মাংস সরবরাহে প্রশাসনের তৎপরতা এখন সময়ের দাবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত