ফাহিমা বেগম লিজা, বয়স ৪৫ বছর; দুই সন্তানের জননী; রাজধানীর কদমতলীর বাসিন্দা। পেশায় তিনি হোমিও চিকিৎসক। লিজা জানান, তার ব্যস্ততা দুই সন্তান এবং সংসার নিয়ে। কোনোদিন তিনি আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠনের রাজনীতি করেননি; কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার আগেও নয়, পরেও নয়। কিন্তু তাকে কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক উল্লেখ করে হত্যা চেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে চার মাসের বেশি সময় আগে।
যুব মহিলা লীগে মহিলাবিষয়ক সম্পাদক পদ নেই। লিজার নামে দেওয়া মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। অভিযোগ উঠেছে, বিবাহ বিচ্ছেদ ও পারিবারিক বিরোধসংক্রান্ত মামলার জেরে সাবেক স্ত্রীকে ফাঁসাতে এ মামলার কলকাঠি নেড়েছেন লিজার সাবেক স্বামী মনিরুল ইসলাম আকাশ। লিজাকে আসামি করতে বাদীকে প্ররোচিত করেছেন তিনি।
মামলার বাদী চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ থানার নওগাঁও গ্রামের রিপন কাজীর ছেলে মো. রাব্বি কাজী। রাব্বি কাজী মামলার বাদী হলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মনিরুল ইসলাম আকাশ ঢাকা বারে বিএনপি ঘরানার আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। লিজার সঙ্গে তার বিয়ে হয় ২০১৩ সালে। নানা টানাপড়েনে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয় গত বছরের অক্টোবরে। সাবেক স্ত্রীর করা যৌতুক নিরোধ আইনবিষয়ক, দেনমোহর ও ভরণপোষণবিষয়ক এবং চেক প্রত্যাখ্যানবিষয়ক তিনটি মামলায় স্বল্প মেয়াদে সাজা হয় মনিরুল ইসলাম আকাশের। স্ত্রীকে ফাঁসাতে তিনিই যে এ হত্যাচেষ্টা মামলায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন, তার কিছু তথ্য-প্রমাণও পাওয়া গেছে। আরজিতে বাদীর নাম রাব্বি কাজী লেখা হলেও মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে আকাশের।
চলতি বছর ২৯ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সিএমএম) আদালতে এ মামলাটি করেন রাব্বি কাজী। মামলার নম্বর সিআর-৩৪৬/২০২৫ (কদমতলী আমলি)। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫৩৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। লিজাকে দেখানো হয়েছে ১৩ নম্বর আসামি হিসেবে। মামলাটি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। আদালত বাদীর জবানবন্দি নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেয়।
লিজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কখনো কোনো দল করিনি। মনিরুল ইসলাম আকাশ আমার সাবেক স্বামী। বিয়ের পর পারিবারিক ইস্যুতে আমি আকাশের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করি। তিনটিতেই তার স্বল্প মেয়াদে সাজা হয়েছে। এর জেরে সাবেক স্বামী আকাশ আমার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করেছেন। সব মামলায় আমি অব্যাহতি কিংবা খালাস পেয়েছি। এর জেরে আমাকে হয়রান করতে যুব মহিলা লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে।’
আইনজীবী মনিরুল ইসলাম আকাশ অবশ্য দাবি করেছেন, লিজাকে তিনি চেনেন না এবং মামলায় তাকে আসামি করার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত নন। মামলার বাদী রাব্বি কাজীর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মামলায় বাদীর যে মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে, সেটি মনিরুল ইসলাম আকাশের।
লিজাকে আসামি করার বিষয়ে জানতে মামলার আরজিতে দেওয়া বাদীর মোবাইল নাম্বারে গত বুধবার যোগাযোগ করে বক্তব্য জানতে চাইলে ফোন রিসিভকারী নিজেকে রাব্বি কাজী নন বলে জানান। এরপর তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি রাব্বি কাজীর আইনজীবী আকাশ। বাদীর মোবাইল নাম্বারের জায়গায় তার মোবাইল নম্বর কেন দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাব্বি কাজীর মোবাইল নাম্বার ছিল না, তাই আমার নাম্বার দিয়েছি।’ আরও জানতে চাওয়া হয়, মামলার ১৩ নম্বর আসামি ফাহিমা বেগম লিজা যুব মহিলা লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক কি না বা এ পদের অস্তিত্ব আছে কি না? জবাবে আকাশ বলেন, ‘এটা বাদী ভালো বলতে পারবেন। আমি জানি না।’ একপর্যায়ে তিনি তার সাবেক স্ত্রী লিজাকে চেনেন না বলে জানান এবং বলেন, ‘আমি তার সাবেক স্বামী নই।’
লিজা জানান, তার এক মেয়ে ও এক ছেলে। দেড় দশক আগে প্রথম স্বামী বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় মারা যান। এরপর তিনি আইনজীবী হওয়ার চেষ্টায় ঢাকা জজ কোর্টে যাতায়াতের সময় আইনজীবী আকাশের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক সময় আকাশ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তাতে রাজি না হওয়ায় আকাশ কৌশলে তার ছেলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করেন। একপর্যায়ে তিনি বিয়েতে রাজি হন। বিয়ের পর বিভিন্ন অজুহাতে তার কাছ থেকে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেন আকাশ। পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। আকাশের বিরুদ্ধে তিনি দেনমোহর ও খোরপোশের একটি, যৌতুক আইনের একটি এবং একটি চেক ডিজঅনারের মামলা করেন। আর আইনজীবী আকাশ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে ছয়টি মামলা করেছেন। আকাশের করা সব মামলায় তিনি খালাস কিংবা অব্যাহতি পেয়েছেন।
ফাহিমা বেগম লিজার করা তিনটি মামলার মধ্যে যৌতুক আইনের মামলায় আইনজীবী আকাশের এক বছর কারাদন্ড ও চেক ডিজঅনারের মামলায় ছয় মাসের কারাদন্ড হয়। দেনমোহর ও খোরপোশের মামলায় লিজা ২৭ লাখ টাকার ডিক্রি পেয়েছেন। লিজার করা মামলায় দন্ডিত হওয়ার কারণেই উল্লিখিত মামলায় তাকে মিথ্যাভাবে আসামি করা হয়েছে।
রাব্বি কাজীর করা মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সরকার ও পুলিশ বাহিনী আন্দোলন নস্যাতের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। আন্দোলন চলাকালে অটোরিকশাচালক বাদী গত বছর ২০ জুলাই সকাল বেলা বাসা থেকে বের হয়ে অটোরিকশা চালিয়ে বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে কদমতলীর মেরাজনগর গ্যারেজের সামনে এলে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সন্ত্রাসী আসামিদের ছোড়া গুলিতে গুরুতর জখম হন। তার ডান বাহু, ডান পাঁজর, ডান হাত ও পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ছররা গুলি লাগে। বাদী যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানার একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে আসামিদের নির্দেশে, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হুমকি-ধমকিতে তাকে চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি (বাদী)। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা নেন। সেখানে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছররা গুলি বের করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছর ৪ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।
