গত বছর এ সময় প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। বেশি দামে আলু বিক্রি করে অধিক লাভবান হওয়ার আশায় কৃষক চাহিদার কথা বিবেচনা না করে, এ বছর অধিক পরিমাণ জমিতে আলু রোপণ করে। দেশে বার্ষিক আলুর চাহিদা ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি টনের বিপরীতে এবার আলু উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ মেট্রিক টন। অন্য বছরের তুলনায় রপ্তানিও কম হয়নি। এরপরও কৃষক আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না। এ বছর প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন মুন্সীগঞ্জে খরচ হয়েছে ২৬ থেকে ২৭ টাকা। সেই আলু হিমাগার পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে, কেজিতে ১১ থেকে ১২ টাকায়। প্রতি কেজি আলুতে ১৫ টাকা লোকসান দিয়ে আলুচাষিদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। আমন ধান কাটার পর কৃষক সাধারণত ওই জমিতে আলু রোপণ করেন। যে বছর আলুর দাম বেশি থাকে পরের বছর কৃষক বাজার চাহিদার কথা বিবেচনা না করে, অধিক পরিমাণ জমিতে আলু রোপণ করেন এবং আলুর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সর্বস্বান্ত হন। বাজারে আলুর দাম কম থাকলে, অন্যান্য শাকসবজির দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে কৃষক বেশি আলু উৎপাদনের অপরাধে অন্য সবজির ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এটাই হলো, বাংলাদেশের কৃষকদের দুরবস্থার কারণ।
কৃষক যদি চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে প্রয়োজনীয় জমিতে আলু রোপণ করার পর অবশিষ্ট জমিতে আলুর বদলে সরিষা, সয়াবিন বা ভুট্টা চাষ করতেন তাহলে কৃষকের এ সর্বনাশ হতো না। সরকারকেও কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে অধিক পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানি করতে হতো না। কৃষকের কান্নার জন্য অপরিকল্পিতভাবে ফসলের চাষাবাদ অনেকাংশে দায়ী। এ জন্য কৃষি বিভাগকে শুধু ফসলের ফলন বৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করায় গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ভোজ্য তেল আমদানি করা হয়। বাজারে ভোজ্য তেলের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তেল বীজের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়ে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে হলে দেশে তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাতের অধিক তেলসমৃদ্ধ তেলবীজ উৎপাদন, উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি ও নীতিসহায়তা। দেশে বছরে ভোজ্য তেলের চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যার পরিমাণ কম করে হলেও ৩০ লাখ টন। এর মধ্যে পাম তেল ১৫ লাখ এবং ১০ লাখ টন সয়াবিন ও বাকি অন্যান্য তেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভোজ্যতেলের আমদানি চাহিদা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩৫ লাখ টনে। তাই এমন পরিস্থিতিতে ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। ধান চাষকে সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে কৃষক। কিন্তু বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে পতিত জমিতে উচ্চফলনশীল স্বল্পমেয়াদি সরিষা বা সয়াবিন চাষ করা যায়।
বর্তমানে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে যেভাবে সয়াবিন চাষ হচ্ছে, সেভাবে সারা দেশে সয়াবিন চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এক সময় উত্তরাঞ্চলের চিনিকল এলাকার কৃষকের জমিতে দুই সারি আখের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় সয়াবিনের চাষ করা হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদিত সয়াবিন বীজ বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে আখের জমিতে সঙ্গী ফসল হিসেবে সয়াবিনের চাষ করতে অনীহা প্রকাশ করেন কৃষক এবং এভাবেই চিনিকল এলাকায় সয়াবিন চাষের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ আঁতুড়ঘরে বিনষ্ট হয়ে যায়। উন্নতমানের প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সরিষা তেলের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে সরিষার দাম কমে যায়। ফলে কৃষক সরিষা চাষে নিরুৎসাহিত হন। এ জন্য কৃষকের উৎপাদিত সরিষার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে রোপণ মৌসুম শুরুর পূর্বেই পণ্যটির ন্যূনতম সরকারি মূল্য ঘোষণা করতে হবে এবং কৃষকের উৎপাদিত সরিষা ন্যায্যমূল্যে সরকারিভাবে ক্রয় করতে হবে। সরিষা তেলের পাশাপাশি সয়াবিন, সূর্যমুখী ও রাইস ব্র্যান অয়েলের ভালো বাজার রয়েছে বাংলাদেশে। পৃথিবীর অনেক দেশে ভুটা থেকেও উন্নতমানের ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। দেশে ধানপ্রধান ফসল হওয়ায় ধানের কুঁড়া থেকে রাইস ব্র্যান উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রচুর। দেশে থাকা ধানের কুঁড়া থেকে, প্রতিদিন সারে চার হাজার মেট্রিক টন রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য দেশে একটি উপযুক্ত বীজনীতি প্রণয়ন প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে সয়াবিন বা সরিষা চাষ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভালো বীজের সংকট একটি বড় সমস্যা। তবে কৃষকদের মধ্যে কম তাপ ও লবণ-সহনশীল বীজ সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। ভোজ্য তেলের শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব না হলেও, উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। গত পাঁচ বছরে দেশে সরিষার চাষ বেড়েছে ৫ গুণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ লাখ ৭০ হাজার ১০০ হেক্টর জমি থেকে ১৬ লাখ ৫ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন তেল বীজ উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে ৮ লাখ ১২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি থেকে ১১ লাখ ৬৩ হাজার ১০০ মেট্রিক টন সরিষা এবং ৮৬ হাজার হেক্টর জমি থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন সয়াবিন তেলবীজ। অপরদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি থেকে ২০ লাখ ৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন তেল বীজ উৎপাদিত হয়। ওই একই বছর ১০ লাখ ৯৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমি থেকে ১৬ লাখ ৭ হাজার মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদিত হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে তেল বীজের উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
কারও কারও মতে, সরিষার মতো সয়াবিন চাষেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নীতিসহায়তা নিয়ে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। সয়াবিন শুধু ভোজ্য তেল নয়, হাঁস-মুরগির, মাছ ও গবাদিপশুর খাবার তৈরিতেও দেশে প্রচুর সয়াবিন খইলের চাহিদা রয়েছে। সয়াবিনের চাষ নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের মতো দেশে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। কারণ এটি বেলে-দোআঁশ মাটিতে ভালো ফলন দেয় এবং সেচও লাগে কম। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব এলাকায় পানিস্বল্পতা রয়েছে, সেখানে সয়াবিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল হতে পারে। বিভিন্ন আমদানিনির্ভর ফসল বিশেষ করে ডাল, তেল জাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে শতকরা ৪ ভাগ হারে কৃষিঋণ প্রদানের বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে সরিষা, তিসি, সয়াবিন, বাদাম চাষে ব্যাংকগুলো শতকরা ৪ ভাগ সরল সুদে কোনো ঋণ প্রদান করে বলে জানা নেই। সময়মতো স্বল্প সুদে তেলবীজ চাষে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করা গেলে, তেলবীজ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে বাদাম, সয়াবিন ও সূর্যমুখী চাষের সম্ভাবনা প্রচুর। ধানের কুঁড়া থেকে তেল উৎপাদন বাড়াতে হলে, পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করতে হবে। ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, কলকারখানা এবং পাহাড় ও টিলা এলাকার অব্যবহৃত জমিতে পাম গাছের চারা রোপণ করতে হবে এবং উৎপাদিত পামবীজ থেকে তেল তৈরির জন্য উৎপাদন এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন পাম তেলের কারখানা স্থাপন করতে হবে। গত কয়েক দিন মৌসুমি বৃষ্টির কারণে ইতিমধ্যে আমন ধানের শীষ বের হওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ধান কেটে কৃষক বিভিন্ন রবি ফসলের চাষ করবেন। তাই বিলম্ব না করে এখন থেকে তেলবীজ উৎপাদনে প্রচার ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মকান্ড শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। দিতে হবে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদার কমপক্ষে শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ স্থানীয়ভাবে মেটাতে হবে। ধানের উৎপাদন না কমিয়ে মাঝারি উঁচু বা উঁচু জমিতে উচ্চফলনশীল এবং স্বল্পমেয়াদি আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে খুব সহজে স্বল্পমেয়াদি সরিষার চাষ করা সম্ভব। পরিশেষে বলতে চাই, প্রচলিত আমন-বোরো শস্যবিন্যাসের পরিবর্তে সারা দেশে আমন-সরিষা-বোরো শস্যবিন্যাস প্রবর্তনের মাধ্যমে, আমন ও বোরা মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে পতিত জমিতে সরিষার চাষ করে দেশে ভোজ্য তেলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।
লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
