তত্ত্বাবধায়ক ফিরলেও ভোট এ সরকারের অধীনেই

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:২৭ এএম

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আনা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত আপিলের ওপর গতকাল মঙ্গলবার চতুর্থ কার্যদিবসে শুনানি হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত সাত বিচারকের আপিল বিভাগে এ শুনানি হয়। এদিন আদালতে এ মামলার পক্ষভুক্ত জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বদরুদ্দোজা বাদল। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জেল হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। আদালত আজ বুধবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে। শুনানি শেষে জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এলেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হবে।

শুনানিতে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা দেশে রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অভিনব দৃষ্টান্ত। এটিকে কেন্দ্র করেই দেশে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখনো সেই ঐকমত্য আছে।’ শুনানিতে তিনি ১৫ বছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার শুনানিতে এ ব্যবস্থা বাতিল হলে ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে সে বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের আশঙ্কার বিষয়টি উল্লেখ করে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করেন। পাশাপাশি এ সরকারব্যবস্থা নিয়ে তিন দশকের বেশি সময় আগে জামায়াতে ইসলামীর ধারণার প্রাসঙ্গিকতাও তুলে ধরেন।

ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল শুনানিতে বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের আগেই আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। অথচ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলায় প্রকাশ্যে আদালতে বলা হয়েছিল যে, আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ের আগেই আওয়ামী লীগ যেটি করেছিল, সেটি আদালত অবমাননা।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কিছু অংশকে (তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের অংশসহ) অবৈধ ঘোষণা করেছিল। এখন হাইকোর্টের এ রায়ের পর ত্রয়োদশ সংশোধনীর এই মামলার কার্যকারিতার প্রয়োজন নেই। হাইকোর্টের এ রায়টি আপিল পর্যন্ত নিয়ে এটি নিষ্পত্তি করেই কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানো যায়।’

                                    আগামী নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই : শিশির মনির

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও সামনের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির। গতকাল ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলার শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সংসদ ভাঙার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান ছিল। এখন তো সেরকম পরিস্থিতি নেই। সংসদ নেই, তাই সেটি ভাঙারও সুযোগ নেই। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রয়োগও এখন সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘শুনানিতে আমরা বলেছি, আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা উচিত। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানে এটি পুনরুজ্জীবিত হলেও বাস্তবে এখনই তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।’

শিশির মনির বলেন, ‘বর্তমানে দেশ একটি অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের তিনটি ম্যান্ডেট বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। সেই ধারাবাহিকতায় আসন্ন নির্বাচন হবে। এরপর নতুন সংসদ গঠিত হলে, তাদের সিদ্ধান্তে আগের তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি পুনর্বহাল বা জুলাই সনদের অনুসারে নতুন কাঠামো গঠন করা যেতে পারে।’

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও আদালতের কোনো পর্যবেক্ষণ চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনটি ত্রয়োদশ সংশোধনীর আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোনো কার্যকর আইন বা সাংবিধানিক সুযোগ নেই।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আপিল বিভাগের দেওয়ার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে করা রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদনের ওপর গত ২৭ আগস্ট শুনানি শুরু হয়। ওইদিন শুনানিকালে আপিলের অনুমতি মঞ্জুর করে আপিল শুনানি, নাকি রিভিউর ওপর শুনানি নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে এমন প্রসঙ্গ ওঠে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য প্রধান বিচারপতি আপিলের অনুমতি দিয়ে ২১ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেন।

১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে তখনকার বিএনপি সরকার। এ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদনের পর ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল বিভাগে আপিল করে রিটকারীপক্ষ। ২০১০ সালের ১০ মে আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় তখনকার প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ। গত ২৫ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষে বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন। এরপর পৃথক সময়ে একই বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত